যানজটের গ্যাড়াকলে চিড়েচ্যাপ্টা জীবনঃ মুক্তির উপায় কি?

ঢাকার বয়স বেড়ে গেছে। প্রায় ৪০০ বছর তার রাজধানী হবারই বয়স। একসময় তার রূপে মুগ্ধ হয়ে - একপাশে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গার টানে বহু বণিক সম্প্রদায় বাণিজ্য করতে এখানে এসেছে। এই এতগুলো বছরে মোঘল-ইংরেজ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ কত শাসনামল দেখেছে আমাদের অতি প্রিয় ঢাকা শহর। সেই ঢাকা শহর কে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের জরিপ বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য শহরের তিলক একে দিয়েছে (সুত্রঃ প্রথম আলো ১৪ই আগষ্ট,২০১২)। আজকের ঢাকা সব সৌন্দর্য্য হারিয়ে যান্ত্রিক নগরীতে পরিনত হয়েছে। দেড় কোটিরও বেশি জনসংখ্যার চাপাচাপিতে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। অনেক নাগরিক সমস্যা তে জর্জরিত। যানজট সেই সব সমস্যার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। নীল আকাশের নিচে আজ আর একা রাস্তা চলা সম্ভব নয়, অন্তত এই ঢাকা শহরে তো নয়ই। আকাশটা নীল আছে ঠিকই কিন্তু রাস্তায় রয়েছে যানজট। এই যানজটের গ্যাড়াকলে চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছে নগরজীবন। এ যেন নাগরিকদের আতঙ্কের আরেক নাম। যেমনঃ ইকবাল সাহেবের কথাই ধরা যাক। ইকবাল সাহেব মধ্যবিত্ত শ্রেনীর ছাপোষা মানুষ। সকাল নয় টায় অফিসে পৌছানোর জন্য প্রায় প্রতিদিনই কাক ডাকা ভোরে বাসে ঝুলতে ঝুলতে অফিসে রওনা দেন। তার মধ্যে যদি দু’একদিন সড়ক অবরোধ, মিছিল-মিটিং বা ভাংচুরের মধ্যে পড়ে যান তাহলে তো কোন কথাই নেই। অফিস পৌছাতেই ইকবাল সাহেবের বারোটা বেজে যায়। বসের বকুনি খেতে খেতে দিন কাটে। আবার বাড়ী ফিরতে গিয়েও বিপত্তি কম নয়। হয়তঃ সন্ধ্যা ছয়টায় বাড়ী ফেরার কথা ছিল কিন্তু ফিরলেন রাত নয় টায়। ওদিকে গিন্নি সেজেগুজে বসে ছিলেন কোন এক বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবার জন্য। ব্যাস হয়ে গেল! গিন্নির মুখ ঝামটা দেখতে দেখতে জীবন কাহিল। ইকবাল সাহেবের মত অনেক মানুষই খুব ভোরে বাসা থেকে বের হন আর ফেরেন প্রায় মধ্যরাতে। নিজের পরিবার-পরিজন এমনকি ছেলেমেয়েদেরকেও ঠিকমত সময় দিতে পারেন না। একেই বলে হয়ত চিড়েচ্যাপ্টা জীবন। তারপরও বলব যে ইকবাল সাহেবের অবস্থা অনেক ভাল। রাস্তা খোড়া-খুড়ি বা বর্ষায় জলজটের কারণে সৃষ্ট যানজটে যদি কোন অ্যাম্বুলেন্স পড়ে তাহলে হাসপাতাল পৌছানোর আগেই রোগীর আত্মীয় স্বজনের আহাজারী শোনা যায়। এতো গেল ব্যক্তিকেন্দ্রিক কথা। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদেরকে হৃদয়টাকে প্রসারিত করে দেশের অর্থনীতির কথা ভাবতে হবে। যানজটের কারণে প্রতিবছর যে পরিমান তেল-গ্যাস পুড়ছে এবং শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, তার মূল্য যদি হিসাব করা হয় তাহলে দেখা যাবে সেই মূল্য দিয়ে বৈদেশিক ঋণ ছাড়াই অনেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া সম্ভব। তাহলে যানজট সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় কি? এই সমস্যার সমাধানে অনেক সময় মেট্রোরেল বা উড়াল সেতুর কথা শোনা যায়। ঢাকার রাস্তায় কোনটা প্রযোজ্য সেসব ঠিক করবেন বিশেষজ্ঞগণ। আমি ঢাকার রাস্তার সামান্য একজন পথিক। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে নিজের দু’একটি চিন্তা-ভাবনা বলে যাই। একটি শহরের রাস্তার আয়তন ওই শহরের মোট ভূখন্ডের আয়তনের যত শতাংশ হওয়া উচিত ঢাকার রাস্তা তার মোট আয়তনের তুলনায় বেশ কম। তার উপর বোঝার উপর শাকের আটি হিসাবে রাস্তায় চলছে অনেক গাড়ি যা কিনা রাস্তার ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি। আবার পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিং এর সু-বন্দোবস্থ না থাকায় প্রায়ই এই গাড়িগুলোকে রাস্তার দুই ধারে পার্কিং করতে দেখা যায়। দুর থেকে মনে হয় রাস্তার দু’ধারে যেন গাড়ির মেলা বসেছে। বর্তমানে যেখানে চার লেনের রাস্তা এই বিপুল পরিমান গাড়িকে সামাল দিতে অপারগ। সেখানে একটি লেন পার্কিং-এ দখল হয়ে গেলে যানজট বাড়তেই থাকবে। পার্কিং এর ব্যবস্থা করার সাথে সাথে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রন করা প্রয়োজন। অন্যদিকে অধিকাংশ প্রাইভেট কারে সিএনজি ব্যবহার করা হয়ে থাকে (সিএনজির মূল্য অকটেন বা পেট্রলের মূল্য থেকে অনেক কম)। গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রন করার জন্য সরকার প্রতি বছর প্রাইভেট কারের উপর ট্যাক্স বাড়িয়ে চলেছে। ট্যাক্সের পরিমান বাড়িয়ে ঢাকার রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রন করা কিছুটা সম্ভব। এর পাশাপাশি প্রাইভেট কারে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ করে প্রতিটি রুটে দ্বিতল বাসের সংখ্যা বাড়াতে পারলে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রনে একটি কার্যকরী পদক্ষেপ হবে। এ ব্যাপারে সরকারের একটি সঠিক নীতিমালার প্রয়োজন। নিজেদেরকে একটু বদলাতে পারলে আমরা চিড়েচ্যাপ্টা জীবন থেকে মুক্তি পেতে পারি। যেমনঃ দোকানের সামনের ফুটপাতের অবস্থাই দেখা যাক। এই সব ফুটপাত কে আমরা অনেক সময় নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভাবতে শুরু করে থাকি। ফুটপাত বেচারার জন্ম হয়েছিল পায়ে চলা মানুষদের চলাচলের জন্য কিন্তু এখন এই সমস্ত ফুটপাত দোকানের মালামাল রাখার একটি সুন্দর জায়গা হয়ে উঠেছে। পথচারীরা তাদের ন্যায্য পাওনা ফুটপাত ছেড়ে রাস্তা দিয়ে হেটে চলছে। ফলে যানজট বাড়ছে। তাই ফুটপাতের উপর দিয়ে পথচারীদের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রাজপথ মানে পথের রাজা। তাই সেই রাজা কে সম্মান দিতে আমরা অনেকেই আমাদের দাবী-দাওয়া প্রকাশের মুক্ত-মঞ্চ হিসেবে রাজপথকে বেছে নিই। দাবী-দাওয়া প্রকাশ করা আমাদের ন্যায্য অধিকার, কিন্তু সড়ক অবরোধ করাটা কি শোভন? ঢাকা শহরের এক জায়গাতে সড়ক অবরোধ করলে তার প্রভাব সব জায়াগাতেই কম-বেশি পড়ে। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। আর ভোগান্তির শিকার হয় আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। যানজটে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকার অভিজ্ঞতা কম-বেশি সব ঢাকাবাসির আছে। অনেক সময় দেখা যায় কিছু ধৈর্যহারা মানুষ ট্রাফিক সিগন্যাল বা গাড়ি চালানোর নিয়ম-কানুনের অমান্য করে আগে যেতে চান। এই সামান্য কারণে প্রায়ই আমাদেরকে যানজটে পড়ে থাকতে হয়। দিন দিন ঢাকার যানজট অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকার গতি মুখ থুবড়ে পড়বে। যানজট নিরসনে ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সরকারের একটি যুগোপযোগি পরিকল্পনা গ্রহন করার প্রয়োজন। এর সাথে প্রয়োজন আমাদের মত সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক ইচ্ছা, নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা এবং শৃংখলতাবোধ। একটি সু-শৃংখল জাতি একটি দেশের উন্নতির অন্যতম হাতিয়ার।
types: 
Article

Facebook comments