সাইবার অপরাধের বিষ মুক্তি

“যে পথ সকল দেশ পারায়ে উদাস হয়ে যায় হারায়ে.... সে পথ বেয়ে কাঙাল পরান যেতে চায় কোন্ অচিনপুরে।।" ছেলেবেলায় রবি ঠাকুরের এই গানটি শুনতে শুনতে মন চলে যেত কোথায় কোন অচিনপুরে-ভিনদেশি কোন গাঁয়। মনে হত সব পথ পাড়ি দিয়ে দুরের কোন বন্ধুর সাথে যদি যোগাযোগ করতে পারতাম। কিন্তু আমার সেই কল্পনা অঙ্কুরেই নষ্ট হত। পরবর্তিতে বুয়েটে পড়তে এসে ইন্টারনেট বা অন্তর্জাল এর সাথে পরিচিত হই। তখন থেকেই সময়-অসময়ের বন্ধু হিসাবে বই আর ইন্টারনেট আমাকে ঘিরে রাখতে থাকে। আজও ইন্টারনেটের সাথে নিয়মিত আমার পথ চলা। শুধু আমি নই, ইন্টারনেট আমাদের সবাইকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বিশেষ করে তরুণপ্রজন্ম আজ ইন্টারনেট ছাড়া এক মুহুর্ত চলতে পারে না। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্য-উপাত্ত, বিনোদণ সবকিছুতেই ইন্টারনেটের জালে জড়িয়ে পড়েছে জনজীবন। তার উপর রয়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম-ফেসবুক, টুইটার, মেসেঞ্জার, স্কাইপে ইত্যাদি কতকিছু। এ প্রসঙ্গে ইন্টারনেট থেকে নেয়া একটি কৌতুক বলি। অনলাইনে পরিচিত হয়ে পরস্পরকে নিজেদের ছবি পাঠানোর পর দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল এক ছেলে আর এক মেয়ে। দেখা হওয়ার পর ছেলেটি মেয়েটিকে বলল, ‘ছবিতে কিন্তু তোমাকে অনেক ছোটখাটো মনে হয়েছিল কিন্তু বাস্তবে তুমি তো অনেক সুন্দরী ও লম্বা।’মেয়েটি বলল, ‘তা তো হতেই পারে। কারণ তোমাকে ছবি পাঠিয়েছিলাম সাইজ ছোট করে।’ ফুলের যেমন কাটা থাকে, মুদ্রার যেমন থাকে অপর পিঠ ঠিক তেমনি ইন্টারনেট কে ঠিকমত ব্যবহার না করলে তারও কাটার খোচা খাওয়া লাগে। সাইবার অপরাধ হল ইন্টারনেটের সেই কাটা। ইন্টারনেটকে খারাপ ভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে লাভের চেয়ে ক্ষতি হচ্ছে বেশি। সাইবার অপরাধের প্রধান শিকার হচ্ছেন নারীরা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে একজন নারীর একান্ত ব্যক্তিগত জীবনকে সবখানে ছড়িয়ে দিয়ে বিকৃত আনন্দ পাচ্ছেন একধরণের অসাধু ব্যক্তিবর্গ। আমরা এখনো পুরুষশাষিত সমাজে বাস করি। সেখানে সাইবার অপরাধের শিকার এই নারীদের সমাজে পথচলা খুবই কঠিন ব্যাপার। পত্রিকা খুললেই প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায়, সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে কোমলমতি স্কুল-কলেজের মেয়েরা বা তরুনীরা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। সাইবার অপরাধ আজ মহামারী হিসাবে দেখা দিয়েছে। এর থেকে আমাদের মুক্তি প্রয়োজন। একজন হত্যাকারী বা ধর্ষকের যদি নারী নির্যাতনের কারনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকে, তাহলে সাইবার অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তিদেরকেও চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। সরাসরি হত্যা করা আর আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়া একই কথা। সরকারের সদিচ্ছার কারণে ইন্টারনেট আজ বেশ সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এটা জ্ঞান বিজ্ঞান-মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। কিন্তু সাইবার অপরাধীরা সেই ভাল সম্ভাবনার গায়ে ব্যর্থতার তকমা এটে দিচ্ছেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে সাইবার ক্যাফে আর মুঠোফোনের কল্যানে ইন্টারনেট আজ হাতের মুঠোয়। সাধারণত উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা সাইবার ক্যাফের প্রধান গ্রাহক। অনেক সাইবার ক্যাফেতে দেখা যায়, কুরুচিপূর্ণ ওয়েবসাইটের ঠিকানা সংরক্ষিত থাকে ইন্টারনেট ব্যবহৃত কম্পিউটারে। এই সমস্ত কুরুচিপূর্ণ ওয়েবসাইটের থেকে পাওয়া ভিডিও-ছবি-উপাত্ত দেখার কারণে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বিকৃতরুচির মানুষ হিসাবে বেড়ে উঠতে থাকে। ফলে সমাজের মধ্যে এক ধরণের অস্থিরতা বিরাজ করে। ইন্টারনেট তথ্য-উপাত্ত-নথি আদান প্রদানের এক যুগ উপযোগি মাধ্যম। এর মাধ্যমে বিশ্বের একপ্রান্তের খবরাখবর-জ্ঞান বিজ্ঞান দ্রুত অন্য প্রান্তে পৌছান সম্ভব। আজকে যে বিশ্বায়নের কথা আমরা বলি তা অনেকাংশেই এই ইন্টারনেটের কারনে সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এই বিশ্বায়ন বা ডিজিটালের যুগে হ্যাকারদের দৌরাত্মে সারাবিশ্বে প্রতিনিয়ত সাইবার অপরাধ বেড়েই চলেছে। এর মাধ্যমে অন্যের ব্যাংক একাউন্ট হ্যাক করে টাকা উত্তোলন করা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন সংস্থার নিজস্ব তথ্য-উপাত্ত চুরি করা এখন নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। সাম্প্রতিক কালের দু’টি ঘটনা সাইবার অপরাধকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অতিসম্প্রতি ইউটিউবে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ) কে অবমাননা করে কুরুচিপূর্ণ একটি সিনেমার অংশবিশেষ দিয়েছে একগ্রুপ। সেকারনেই আমেরিকার একজন রাষ্ট্রদুত কে জীবন দিতে হল উত্তেজিত জনতার হাতে। আবার বাংলাদেশে ঘটেছে আরেক ঘটনা। কেউ একজন কোরআন কে অবমাননা করা একটি ছবি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী একজন ব্যক্তির ফেসবুকে ট্যাগ করেছে। সেই কুরুচিপূর্ণ ছবি ছড়িয়ে গেছে সবখানে। তাই নিয়ে কক্সবাজারের রামুতে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো বৌদ্ধ মন্দিরে এবং আশেপাশের বৌদ্ধ মানুষের বাড়িতে আগুন দিয়েছে কিছু উশৃংখল মানুষ। পুড়ে গেছে এত বছরের পুরোনো বাংলাদেশের ঐতিহ্য, স্থাপনা, পুথি এবং বুদ্ধমূর্তি। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশে রেসিজম বা বর্ণবাদ সমস্যা খুবই প্রকট। কিন্তু বাংলাদেশ অনেকটাই এর থেকে মুক্ত ছিল। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে যে, সাইবার অপরাধের কারণে আজ বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি হুমকির সম্মুখিন। সাইবার অপরাধ আজ এমন এক জায়গায় দাড়িয়েছে যে এর অভিশাপ থেকে মুক্তি না পেলে দেশে গৃহযুদ্ধও লেগে যেতে পারে। শুধু আইন করে এ সমস্যার সমাধান হবে না।আইনের কঠোর প্রয়োগের প্রয়োজন আছে।অন্যদিকে আমাদের সবাইকেই সাইবার অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। এই ব্যাপারে প্রচুর আলোচনা করা প্রয়োজন, যাতে সমাজের সব শ্রেনী-পেশার মানুষের সচেতন করা যায়। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে যেকোন সমস্যা থেকে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব। যেভাবে একদিন আমরা যৌতুক সমস্যার সচেতনতা বৃদ্ধি করেছিলাম।
types: 
Article

Facebook comments