খাবার যখন বিষ !!!

জ্যৈষ্ঠ মাস হলো বাংলার মধুমাস। বাজারে গেছি আম কিনতে। আমের যা দাম তাতে আমের গায়ে হাত দেয়াটা রীতিমত কষ্টকর। তারপরও বছরের আম বলে কথা। না খেতে পারলে কি আশ মেটে! দোকানদারের সাথে দামদর করছি। পাশের দোকানে উচ্চস্বরে রেডিও বাজছে। ‘...লইজ্জা!...আরে ওইখানেও প্রিজারভেটিভ আছে...।’ হঠাৎ শুনতে পেলাম পিছনে একটি বাচ্চা মেয়ে তার বাবা কে প্রশ্ন করছে, ‘বাবা প্রিজারভেটিভ কি?’ প্রশ্নটা শুনে নিজেই কেমন যেন হকচকিয়ে গেলাম। তাইতো প্রিজারভেটিভ জিনিষটা কি? মাথার ভিতর ঘুরতে লাগল প্রশ্নটি। যাইহোক অনেক দামাদামি করে আম কিনে বাসায় ফিরলাম। কিন্তু খাব কিনা বুঝতে পারছিনা। বারবার আড়চোখে আমগুলোর দিকে তাকাচ্ছি। মাথার ভিতর প্রিজারভেটিভ এর ঝলকানি টের পাচ্ছি। প্রিজারভেটিভের বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘সংরক্ষণকর বস্তু বা ব্যবস্থা’। আমাদের চারপাশে অনেক ব্যাকটেরিয়া, ইষ্ট, ছত্রাক এবং বিভিন্ন ধরণের অনুজীব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এরা সুযোগ পেলেই খাদ্যের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। অর্থ্যাৎ কিনা খাদ্যকে পচিয়ে নষ্ট করে। আর সেকারনেই খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা বহু আগে থেকেই চলে আসছে। যেমন ধরা যাক, শুটকী মাছ- এটা একধরণের মাছের সংরক্ষণ ব্যবস্থা। সেরকম আচার, লোনা ইলিশ, হিমাগারে বিভিন্ন ধরণের সবজি, মাছ, তরকারী রাখাও কিন্তু একধরণের সংরক্ষণ ব্যবস্থা। আমাদের কি মনে পড়ে সেই ঝান্ডুদার কথা? সেই যে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘রসগোল্লা’ গল্পের ঝান্ডুদা। মিষ্টির ভ্যাকুয়াম টিন খুললেই সব মিষ্টি নষ্ট হয়ে যাবে বলে বন্দরের কর্মকর্তার সাথে ঝগড়া শুরু করেছিলেন। এটাও একধরণের সংরক্ষন ব্যবস্থা। এগুলো হলো প্রাকৃতিক ভাবে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া। অনেক সময় নানান ধরনের কেমিক্যাল দিয়েও খাদ্য সংরক্ষণ করা যায়। যেমনঃ লবণ, ভিনেগার, সাইট্রিক এসিড, অ্যাসকরবিক এসিড, পটাসিয়াম সরবেট, সোডিয়াম বেনজয়েট প্রভৃতি। আবার বায়ো সংরক্ষণ বীজানু দিয়েও খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা চলে আসছে অনেক আগে থেকে। সেরকম একটি পদ্ধতি হল ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া-যা কিনা অনেক সময় বিভিন্ন কেমিক্যালের সাথে মিলে একযোগে প্যাথজেন, বর্ণালী অনুজীব, ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া কে ধ্বংস করে খাদ্যকে সংরক্ষণ করে থাকে। কিন্তু খাদ্য সংরক্ষণের নামে আমাদের দেশে কী করা হচ্ছে? খাদ্যের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশিয়ে যা করা হচ্ছে তাতে অনুজীব তো অনুজীব-খোদ মানুষকেই মারবার পাঁয়তারা চলছে। খাদ্য সংরক্ষণের নামে খাদ্যের মধ্যে যা মিশানো হয় তা সংরক্ষণকর বস্তু তো নয়ই বরং বিষ। প্রতিনিয়ত এই বিষ আমরা সবাই উদরপূর্তি করে যাচ্ছি। এটাই বোধহয় তেলাপোকার জীবন। রাজশাহীর কানসাটে যে খিরসাপাতি আম পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই কিন্তু পাকলে পুরোপুরি হলুদ হয় না বরং পুরোটাই সবুজ থাকে শুধু মুখের দিকটা একটু হলুদের আভা ছড়িয়ে থাকে। কিন্তু বাজারে যে আম পাওয়া যায় তার খোসা পুরোটাই হলুদ। ইথাইলিন, ইথরি, কারবাইড স্প্রে করে এগুলোকে কৃত্রিমভাবে পাকানো হয় তাতে পুরো আমটা হলুদ দেখা যায়। পুরোপুরি হলুদ না দেখলে নাকি ক্রেতাগণ সেই আম কিনতে চাননা-অভিযোগ দোকানদারের। কিন্তু এতে করে ফলের খাদ্য গুন-স্বাদ-গন্ধ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে এটা একটা বিষাক্ত খাদ্য দ্রব্যে পরিণত হয়। আর সেই আম-জাম-কলা-লিচু আমরা আমাদের পরম প্রিয় আপনজন-বাবা, মা, স্ত্রী, পূত্র, কন্যা কে নিজের কষ্টের পয়সায় কিনে খাওয়াচ্ছি। তাহলে আমরা কি অর্থ উপার্জন করি শুধুমাত্র বিষ কেনার জন্য? অন্যদিকে বিদেশী ফল-আপেল, কমলা, আঙ্গুর, চেরী ফল এর অবস্থা যে কী হচ্ছে তা স্রষ্টাই একমাত্র জানেন। এতো গেল ফলের কথা। ফল না খেলে কি হয়? কিন্তু বাঙ্গালীর মাছ-চাল-সবজী-ডাল না খেলে চলবে কি করে। মাছে-ভাতে তো বাঙ্গালী। কিন্তু বিষ সেখানেও আছে। ফরমালিন নামের এক বিষাক্ত কেমিক্যাল আছে যা সাধারনতঃ বেওয়ারিশ লাশে ব্যবহার করা হয় যাতে লাশ না পচে। ফরমালিনের তোড়ে সেই সব লাশের রং কালো হয়ে যায়। সেই ফরমালিন দিয়েই ফল-মাছ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বাজারে গেলে দেখা যায়, মাছে মাছিও বসে না ফরমালিনের কারণে। আজকাল শোনা যায় চাল-ডাল-চিড়া-মুড়িতেও ইউরিয়া মেশান হচ্ছে রং ফরসা করার জন্য। রং ফরসা না হলে ক্রেতাগণ নাকি সেই চাল-চিড়া-মুড়ি কিনতে চাননা। তাই কিছু অসাধু ব্যবসায়ীগণ ক্রেতাদের মনোরঞ্জনের জন্য রং ফরসা করার মহান দ্বায়িত্ব কাধে তুলে নিয়েছেন। আবার খাবার কে রঙ্গিন করার জন্য ফুড কালারের পরিবর্তে কাপড়ে ব্যবহৃত রং ব্যবহার করা হচ্ছে। পেটে খেলে তবেই তো পিঠে সয়। এখনতো দেখা যাচ্ছে ফল-ভাত-মাছ-সবজী সবখানেই বিষ। তার উপর আছে নদী-লেকের পানি দূষণ, শব্দ দূষণ, বাতাসে সীসা ইত্যাদি। পেটেও সয় না পিঠেও না। পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণী বা উদ্ভিদ একটি আরেকটির উপর নির্ভরশীল। অর্থ্যাৎ একজন আরেকজনের খাদ্য। একে খাদ্য শৃংখল বলা হয়ে থাকে। এই শৃংখলের একটি জায়গায় বিষ প্রয়োগ করলে সেটা কিভাবে সমগ্র খাদ্যে ছড়িয়ে পড়ে তা একটি উদাহরণ থেকে দেখা যাক। পিপড়ার খাদ্য বহণ ও সংরক্ষণের পদ্ধতিটি বেশ মজার। একটি পিপড়ার মুখ থেকে আরেকটি পিপড়া খাদ্য নিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পিপড়ার লাইনের কোন এক জায়গায় যদি বিষ দেয়া যায় তখন দেখা যাবে-মুখ থেকে মুখে খাবার বদলানোর কারণে ওই লাইনের সব পিপড়া মারা যায়। আমাদের এই খাদ্য শৃংখলটাও অনেকটা এরকম। খাদ্য শৃংখলের কোন এক জায়গায় যদি বিষ মেশান হয় তবে ধীরে ধীরে একসময় পুরো খাদ্য শৃংখলটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। এইসব বিষ গ্রহনের ফলে ক্যান্সার, কিডনীর সমস্যা, অ্যাজমা, লিভার সিরোসিস, ফুসফুসের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। এমনকী বিকলাংগ শিশুর জন্ম হতে পারে। এর দায় আমাদের সবার। আমরা কত খারাপ মানুষ যে, আমরা নিজ হাতে আমাদের জাতিকে ধ্বংস করে চলেছি। ১৯৭১ সালে পাকি বাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসররা আমাদের জাতির পবিত্র সন্তান-বুদ্ধিজীবিদের কে হত্যা করেছিল। আজ আমরা নিজ হাতে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে শুধু হত্যা নয়-বিকলাংগ করতে যাচ্ছি। আমরা এভাবে আমাদের খাদ্য শৃংখল কে ধ্বংস করতে পারিনা। একজন আম চাষী হয়ত মনে করতে পারেন যে, আমি বা আমার ছেলেমেয়ে তো ওই বিষাক্ত আম খাব না কিন্তু তিনি কি ভেবে দেখেছেন একবার, তিনি যে মাছ বাজার থেকে কিনছেন সেটা তার আরেক ভাই ফরমালিন দিয়ে রেখেছে। তাহলে কী আমাদের বিবেক-বুদ্ধি-লজ্জা সব জায়গায় প্রিজারভেটিভ দেয়া আছে ? সরকার সহ বুদ্ধিজীবি এমনকি সাধারণ মানুষ কে বিষ প্রতিরোধের ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা বিষ সরকার-সাধারণ মানুষ-বিষ প্রয়োগকারী-বিষ ভোগকারী কাউকেই ছাড় দেবেনা। খাদ্য শৃংখল নষ্ট হলে সবাই আমরা জাতিবদ্ধভাবে বিপদে পড়ব। গত ২৪ জুলাই, ২০১২ ‘প্রথমআলো’ পত্রিকায় প্রকাশ চট্টগ্রামে ভেজালবিরোধী অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত দুটি সুপার শপকে (ওয়াল মার্টকে ৫০ হাজার এবং আগোরাকে ৫০ হাজার) এক লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। অভিযোগ হল সেই দুই সুপার শপে ফরমালিন দেয়া আঙ্গুর ও চেরী ফল বিক্রি হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা সরকারের ভাল উদ্যোগ। কিন্তু এতে করে কি খাদ্যে বিষ দেয়া বন্ধ হবে? এই জরিমানা আসলে শেষ পর্যন্ত কাদের ঘাড়ে এসে পড়ে,ব্যবসায়ীদের নাকি ভোক্তাদের? ইলেক্ট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।যেভাবে যৌতুকবিরোধী প্রচারণা, এইডস সম্পর্কে সচেতনতা চলছে। আসলে যিনি ভোক্তা তিনি সচেতন না হলে এটা রোধ করা সম্ভব হবেনা। পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির স্থাপন করতে হবে। কেননা একজন সন্ত্রাসীকে, একজন হত্যাকারীকে, একজন মাদক বা নারী-শিশু পাচারকারীকে যদি প্রচলিত আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকে তাহলে একজন খাদ্যে বিষপ্রয়োগকারীকেও সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা যেতে পারে।
types: 
Article

Facebook comments