জীববিবর্তন সাধারণ পাঠ বইয়ের একটি সাধারণ আলোচনা

“অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া রহিয়াছে।” দুনিয়াতে জীবজগতের বিভিন্ন প্রজাতির অভিযোজিত হয়ে টিকে থাকাটাই বড় স্বার্থকতা। আমাদের চারপাশে জীবন্ত সব কিছু মিলে তৈরী হয় জীবজগত। অর্থ্যাৎ অতি বৃহৎ তিমি থেকে একেবারে অতি ক্ষুদ্র অনুজীব পর্যন্ত সমস্ত জীবন্ত প্রানী বা উদ্ভিৎ কেই জীবজগত বলা হয়ে থাকে। বৈচিত্র্যময় এই দুনিয়ায় বিচরণ করে বিচিত্র সব জীব।এই জীববৈচিত্র ও অভিযোজনের মূলে রয়েছে জীববিবর্তন। প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের মাধ্যমে জীববিবর্তন কে বিজ্ঞানীমহলে তুলে ধরেন চার্লস ডারউইন। অনেক বিজ্ঞানীদের মতে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তত্ত্বগুলোর একটি। জীববিবর্তনবাদ সম্পর্কে কথা বলতে গেলে অনেকেই একটু বাকা হাসি হেসে প্রশ্ন করে থাকেন-‘তাহলে কি আমরা বানর থেকে এসেছি? বা আমাদের পূর্বপুরুষরা কি বানর ছিল?’ জীববিবর্তন আসলেই একটি খটমটে বিষয়। অন্ততঃ আমার তাই ধারণা। গত অমর একুশে ২০১৪ বইমেলা তে লিটল ম্যাগ চত্ত্বরে ঘোরাফিরার সময়ে ‘জীববিবর্তন সাধারণ পাঠ’ বইটি হাতে আসে। এক নিঃশ্বাসে বইটি পড়তে থাকি। আর তার সাথে জীববিবর্তন নিয়ে মনের মধ্যকার মেঘ খানিকটা কেটে যেতে থাকে। অনেক না বলা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতে থাকি এই বইটি থেকে। ‘জীববিবর্তন সাধারণ পাঠ’ শিরোনামে যে বইটির কথা বলছি, সেটি আসলে একটি অনুবাদ গ্রন্থ। মূল বইয়ের নাম- ‘আ্যম আই এ মাঙ্কি? সিক্স বিগ কোয়েশ্চন আ্যবাউট এভ্যোলুশন’-লেখকঃ ফ্রান্সিসকো জ়ে আয়ালা। বইটি জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত। লেখক ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেশবিদ্যা ও বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক। বিশ্বের জীববিজ্ঞানী মহলের ‘বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের রেনেসাস মানুষ’ হিসাবে পরিচিত। বইটি অনুবাদ করেছেন অনন্ত বিজয় দাশ ও সিদ্ধার্থ ধর নামের দু’জন প্রতিভাবান তরুণ। আর প্রকাশ করেছে ‘চৈতন্য’। অত্যন্ত সহজ-সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় অনুদিত হয়েছে বইটি। সবচেয়ে বড় কথা কঠিন কঠিন তত্ত্ব ও বিজ্ঞানের শক্ত ভাষাকে সুললিত ভাবে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন এই দুই অনুবাদক। বাংলা ভাষায় এরকম একটি বইয়ের প্রয়োজন ছিল অনেকদিন ধরেই। যারা বিজ্ঞান কে ভালবাসেন বা জীববিজ্ঞান বিষয়টি স্কুল-কলেজে পড়েছেন তাদের জন্য সহজবোধ্য করে বইটি সাজানো হয়েছে।জীববিবর্তন নিয়ে খুবই সাধারণ কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সাধারণত আমাদের মনের মধ্যে খেলা করে। সেই সব প্রশ্নগুলোকে মাথায় রেখে তার উত্তরের ঝাপি নিয়েই লেখা এই বইটি। ‘আমি কি বানর থেকে এসেছি?, বিবর্তন শুধুই কি একটি তত্ত্ব?, ডিএনএ কি?, সকল বিজ্ঞানীর কাছে কি বিবর্তন তত্ত্ব গ্রহনযোগ্য?, জীবনের সূত্রপাত হলো কি করে? এবং জীববিবর্তন ও ঈশ্বর কেউ কি উভয়টিতে বিশ্বাস রাখতে পারে?’ এরকম মোট ছয়টি প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে এখানে। ছয়টি অধ্যায়ের মাধ্যমে সেই সব প্রশ্নের উত্তর বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। মানুষের খুব কাছাকাছি গোত্র যে বানর নয় বরং এইপ গোষ্ঠী অর্থ্যাৎ শিম্পাঞ্জি, গেরিলা বা ওরাংওটাং, সেটি খুব সুন্দরভাবে যুক্তি দিয়ে এবং তথ্যের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বইটির প্রথমেই। মানুষ, যাকে বলে কিনা হোমো সাপিয়েন্স এবং শিম্পাঞ্জি সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘মিসিং লিঙ্ক’ হিসাবে হোমিনিডের বর্ণনা বা তাদের আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষন নিয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে তা পড়তে গেলে মনে হয় আমিও সেই আবিষ্কারকদেরই একজন। আর এভাবেই এগিয়ে চলেছে বিবর্তনের ইতিহাস বর্ণনা ও বিবর্তন তত্ত্ব প্রকাশ। বিবর্তনবাদ কি শুধুই একটি তত্ত্ব নাকি এর মধ্যেও রয়েছে বাস্তব ঘটনা। সে বিষয়ে চমৎকার উত্তর দিয়েছেন লেখক। তত্ত্ব-প্রকল্প-বাস্তব ঘটনার মধ্যে যেমন একটি সুন্দর যোগসূত্র আছে ঠিক তেমনি প্রকল্প বা বাস্তব ঘটনা যেন দুই মেরুর বাসিন্দা। সেই তত্ত্ব-প্রকল্প-বাস্তব ঘটনার দোলাচালে থেকে লেখক অত্যন্ত সুচারুভাবে জীববিবর্তন কে একইসাথে ফ্যাক্ট ও প্রকল্প হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। পরবর্তি অধ্যায়ে তাই আমরা লেখককে গর্ব করে বলতে দেখি, ‘জীববিবর্তন তত্ত্ব দুনিয়ার অধিকাংশ বিজ্ঞানীরা গ্রহন করেছেন।’ শুধু তাই নয় বিভিন্ন পশুপাখির উদাহরণ টেনে, সুন্দর সুন্দর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে জীববিবর্তন তত্ত্ব কেন গ্রহনযোগ্য তার আলোচনা করতে সচেষ্ট হয়েছেন। আবার অন্যদিকে ‘জীবনের সূত্রপাত হলো কি করে’ অধ্যায়টিতে লেখক পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি বিষয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের ভাবনা কে একত্র করতে সমর্থ হয়েছেন। এছাড়াও দ্বিসূত্রক ডিএনএ এর গঠন ও তার প্রতিটি সূত্রের সাথে যে মইয়ের মতো ধাপ থাকে এবং সেই ধাপগুলোর প্রতিটিতে বিভিন্ন ধরণের নিউক্লিওটাইডের কোডিং করা আছে সেটিও বেশ চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বইটিতে। ডিএনএ নিয়ে এতটুকু আলোচনা করেই ক্ষান্ত হননি লেখক বরং নিউক্লিওটাইডের কোডিংগুলো কিভাবে আরএনএ উপর প্রতিচ্ছবি ফেলে মানবদেহের গঠন, বৈচিত্র্য ও আচার-আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে তাও আলোচনা করে দেখিয়েছেন। সবগুলো অধ্যায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও সারাংশ অধ্যায়টি হলো শেষ বা ষষ্ট অধ্যায়টি। কিভাবে জীববিবর্তনবাদ ও ধর্ম হাতে হাত ধরে পাশাপাশি চলতে পারে তা অনুধাবন করার জন্য ঘরের বাইরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দুটি জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন লেখক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অধিকাংশ ধর্মেই জীববিবর্তনকে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। লেখক এখানে তার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ধর্ম বিশ্বাসের সাথে জীববিবর্তনকে সমন্বয় করার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। একই সাথে ধর্ম যে প্রতি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান কে উৎসাহ দিয়ে আসছে বা বিজ্ঞান ধর্মকে প্রেরণাদাত্রী হিসাবে মূল্যায়ন করে থাকে সেই সম্পর্কে বেশ সুখপাঠ্য একটি আলোচনা করেছেন। সবশেষে লেখক ষষ্ঠ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এই ভাবে, ‘হ্যা, একজন মানুষের পক্ষে জীববিবর্তন ও ঈশ্বর উভয়কেই বিশ্বাস করা সম্ভব।......... জীববিবর্তন তত্ত্ব আসলে ধর্মের কোনো শত্রু নয় বরং বন্ধু।’ কিশোর উপযোগি করে লেখা ও অনুবাদ করা এই বইটি এক অর্থে সাধারণ পাঠকদের জীববিবর্তনবাদ সম্পর্কে জানার তৃষ্ণা কে বহুলাংশেই নিবারণ করবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণার মূলে আঘাত করে সংস্কারমুক্ত একটি বিজ্ঞানমনস্ক সভ্যতা গড়ার কাজে ভূমিকা রাখবে। আর সেই বিজ্ঞানমনস্ক জাতি ধর্ম ও বিজ্ঞান কে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বি বা প্রতিবন্ধক ভাববে না।
types: 
Article

Facebook comments