হলুদ গাঁদা ফুল

Primary tabs

১) 
শহরের অদূরে একটি বস্তি। আর সেই বস্তিতে বেশ কয়েকটি ঝুপড়ির মত ঘর। প্রতিটি ঘরে ছেলে-বৌ-নাতি-নাতনি নিয়ে বাসিন্দা অনেক। সেই সব নানারকম মানুষের পেশা নানামুখি। কেউ হয়ত রিকশা চালায় তো কেউ চালায় ট্রাক-বাস আবার কেউ বাসা-বাড়িতে কাজ করে তো কেউ চাকরি করে গার্মেণ্টসে। আসলে সমাজের উচু শ্রেনীর মানুষদের ফুট-ফরমায়েশ খাটা আর তাদের সেবা করে যে আয় হয় তাই দিয়ে জীবন চালায় এখানকার বস্তিবাসি। সকলের পেশা বা চাল-চলন আলাদা হলেও একে অপরের খোঁজ খবর ঠিকই রাখে। বিপদে আপদে পাশে থাকে। বস্তির উঠানে বসানো চাপ-কলপাড়ে সবার সাথে সবার দেখা হয় সকালবেলা তে। সরকারী পানির বিল ঠিকমত দেবার সামর্থ্য নেই এইসব মানুষদের। ফলে নিজেদের চাঁদার টাকায় বসানো চাপ-কলটিই এখানকার পানির চাহিদা মিটিয়ে থাকে। খুব সকালে বস্তির মহিলারা গোসল ও অন্যান্য কাজ সেরে নেয় কলপাড়ে তারপর বস্তির অন্যান্য পুরুষেরা আসে সেখানে প্রাত্যহিক কাজ-কর্ম সারতে। তারপর শুরু হয় জীবন ও জীবিকা নির্বাহের সংগ্রাম। 
মাঘের শেষে সেরকম একটি দিন। শীত যায় যায় করছে। গাছের সবপাতা ঝরে গিয়ে নতুন পাতা গজানো শুরু হয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু যেন দেরী হয়ে গেল জমিলার। রাতে ঘুমোতে ঘুমোতে প্রায়ই দেরী হয়ে যায়। তাঁর ছোট মেয়ে হাসির বায়না কোনমতেই থামতে চায় না। শুধু বাবার কাছে যাবার বায়না। হাসি যেন বুঝতেই চায় না যে তাঁর বাবা অনেক দূরে মালভর্তি ট্রাক নিয়ে গিয়েছে। সেখান থেকে নতুন খ্যাপ পেলে সে চলে যাবে আরেক জেলায় আর খ্যাপ না পেলে বাড়ি ফিরে আসবে। বেশি খ্যাপ ধরতে না পারলে মহজনের জমার টাকা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায় হাসির বাবা মকবুলের। আর তাছাড়া মহজন কে বেশি বেশি লাভ দিতে না পারলে মহজন হয়ত মকবুল কে আর স্টীয়ারিং এ বসতে দিবে না। কিন্তু বাপের আদরের মেয়ে হাসি দিনের পর দিন বাবার আদর-স্নেহ পায় না, তাই প্রতি রাতে বাবার সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলে ঘুমোতে যায়। জমিলাও মাঝে মধ্যে সংসারের টুক-টাক কথা-বার্তা বলে থাকে। 
-‘জমিলা বু ও জমিলা বু, ফ্যাক্টোরিতে যাবা না?’, দরজার ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভাঙ্গে জমিলার। 
দরজা খুলে দেখে রত্না ঘরের বাইরে দাড়িয়ে। রত্না জমিলাদের কয়েকঘর পরে শশুর-শাশুড়ির সাথে থাকে। সবে বিয়ে হয়েছে। স্বামী সুখেন মকবুলের সাথে ট্রাকের হেলপারি করে। জমিলা রত্না কে দেখে ইতস্তত হয়ে বলে, ‘তোগো চান-টান করা শ্যাষ?’
-‘শুধু আমাগো? ব্যাটাগো চান করা শ্যাষ হইল বলে।’ রত্না উত্তর দেয়।
-‘তইলে তুই ফ্যাক্টোরিতে যা গা। আমি হাত-মুখ ধুইয়ে, হাসির খাওন রাইন্ধা আইতাছি একটু পরে।’
-‘না আমি একলা যাব না, জমিলা বু। লও একলগে যাই। আমি হাসির ভাত রাইন্ধা দিতাছি, তুমি হাত-মুখ ধুইয়া কাপড় পিইন্দা লও।’
ঘরের কাজকর্ম সেরে জমিলা আর রত্না হাটতে হাটতে গার্মেণ্টস ফ্যাক্টোরির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। সামনে নাকি বসন্ত উৎসব। হলুদ জামা কাপড়ের চাহিদা হবে খুব বিপনি-বিতানগুলো তে। তাই জমিলা-রত্নাদের কাজের চাপও বেশি। রত্না জমিলাকে জিজ্ঞেস করে, ‘এত এত হলুদ কাপড় চোপড় কিইন্যা বড়লোকদের কি লাভ হয় জমিলা বু।’
-‘কি জানি বইন। বড়লোকদের টাকা থুইবার জায়গা নাই তো তাই এইসব উৎসব পালন কইরে কিছু টাকা খরচ করে। যাতে আমাগো মত মাইনসের রুজগার হয়। তাছাড়া সুখেন কাছে নাই ফাল্গুনের আনন্দ বুঝবি কি করে মুখপুড়ি?’
শুনে রত্না একটু লজ্জা পায়। কথাটা বলে বটে জমিলা। কিন্তু মন পড়ে রয় অনেকদিন আগে ঘটে যাওয়া স্মৃতিতে। বিয়ের পরপরই ফাল্গুনের এক উৎসবে হলুদ শাড়ি পড়ে জমিলা মকবুলের সাথে সারা শহর রিকশায় ঘুরে বেরিয়েছিল। ভাবতেই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। একটা দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে জমিলার। আজ দিন দশেক হলো বাড়ির বাইরে মকবুল। একটুও কি মনে পড়ে তাদের কে মকবুলের? কথা বলতে বলতে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ফ্যাক্টোরিতে পৌছে যায় ওরা। 
২)
-‘ওস্তাদ আর খ্যাপ ধইরো না। অনেকদিন হইলো বাড়িত বাইরে আছি। মনডা খুব পুড়ায় বাড়ির জন্যি।’ সুখেনের কথাটা হঠাৎ করে কানে ঢোকে মকবুলের। হাতের তাস মুখের সামনে থেকে নামিয়ে বেশ গরম চোখে তাকায় মকবুল সুখেনের দিকে। 
এমনিতে তাস খেলা জমে উঠেছে বেশ। ট্রাকের পিছনের ডালায় বসে চলছে এই খেলা অন্যান্য ট্রাক ড্রাইভারদের সাথে। দুই লিটার কোক বাজি ধরা হয়েছে। পরিবার পরিজন থেকে দূরে এসে এটাই যেন তাদের একমাত্র বিনোদন। এতে করে বাড়ির কথা খুব একটা মনে পড়ে না। এর মধ্যে সুখেনের প্যানপ্যানানিতে একটু বিরক্ত হয় মকবুল। 
-‘এই তোদের এক দুষ। নতুন বিয়া কইরা বউ ছাড়া থাকবার পারস না। খালি বাড়ি যায় যায় করস।’, মকবুল খেকিয়ে ওঠে।
-‘আইচ্ছা ওস্তাদ তুমার কি জমিলা ভাবি আর হাসির কথা মনে উডে না। বুকে হাত রাইখা কইবার পারবা?’
মকবুল থত মত খায় উত্তর দিতে গিয়ে। এমনসময় এক পার্টি আসে ট্রাক ভাড়া করতে। মকবুল মালের বিররণ ও যাওয়ার জায়গা জিজ্ঞেস করে পার্টিকে। আসলে এক জায়গায় জনসভা আছে। সেখানে লোক নিয়ে যেতে হবে। সব শুনে হিসাব করতে থাকে ট্রাক ভাড়া। হঠাৎ কি যেন মনে হয় মকবুলের। জনসভাতে লোক নিয়ে যেতে মন সায় দেয় না তাঁর। জিজ্ঞেস করে সুখেন কে, ‘আইজ মাঘ মাসের কয়দিন রে সুখেন?’ 
সুখেনও হাত গণনা করে হিসাব করে বলে, ‘মাঘের শেষ দিন আইজ। কাইল থন ফাল্গুন মাস পড়ব’
শুনে মকবুল সুখেন কে মুচকি হেসে বলে, ‘অ তাই কই, বউয়ের জন্যি পিরিত উথলিয়া উডে ক্যান। বাড়িত যাওয়ার জন্যি খালি ফাল পারতাছস। যা আর খ্যাপ ধরুম না।’
কথাটা শুনে সুখেনের হৃদয় যেন লাফ দিয়ে বের হয়ে যেতে চায়। ভাড়া চাওয়া লোকগুলোকে বলে, ‘হবে না ভাই ট্রাক ভাড়া। আমরা বাড়িত যাব।’
ভাড়া নিতে আসা সেই পার্টি মহাজন কে ফোন দেয়। তারা নাকি মহাজনের পূর্ব পরিচিত। সব শুনে মহাজন ফোন দেয় মকবুল কে। মুখে যা আসে তাই বলতে থাকে।
-‘ক্যারে মকবুল। ভাড়া হবি না ক্যানে? সুখেনের শরীলডায় কি খুব ত্যাল জমছে নাকি রে। কাষ্টোমার হইল গিয়া হাতের লক্ষী। হাতের লক্ষী পায়ে ঠেললি ঘরের লক্ষী থাকবি না নে। আর জনসভার কামে লাভ তো বেশি।’
মকবুল ফোনের ওপাশে থেকে আমতা আমতা করতে থাকে মহাজনের কথা শুনে। একদিকে মহাজনের আচরণ আর অন্যদিকে সুখেনের ধেই ধেই করে নাচতে থাকা- সব মিলিয়ে দোদুল্যমান পরিস্তিতির মধ্যে পড়ে যায় মকবুল। বার বার করে হাসি আর তাঁর মায়ের মুখখানা চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে। সকরুন দৃষ্টিতে তাকায় সুখেনের দিকে। তারপর সুখেন কে বলে গাড়িতে উঠতে। গাড়ি স্টার্ট দেয় মকবুল। হ্যাচকা টানে ট্রাক চালাতে থাকে মকবুল। কাষ্টোমার দুইজন আর সুখেন কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। একদিকে সুখেনের চিৎকার আরেকদিকে মহাজনের বারবার ফোন কোনকিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই মকবুলের। আপনমনে খুব জোরে ট্রাক চালাতে থাকে।আর ভাবতে থাকে তাঁরা গরীব বলে কি উৎসব পার্বণের দিনে পরিবারের সাথে সময় কাটাতেও পারবেনা মকবুল-সুখেনরা?
৩) ‘কি রে জমিলা? আইজ এত ভোরে কলপাড়ে তুই?’ সুয্য আইজ কোনদিক দিয়ে উঠল? কমলামাসির জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় জমিলার দিকে। প্রশ্ন শুনে একটু লজ্জা পায় জমিলা। 
আস্তে আস্তে কলপাড়ে ভীর বাড়তে থাকল। নিত্যদিনের মত। রত্না জমিলাকে দেখে বলল, ‘জমিলা বু চুলে গোজা গ্যান্দা ফুলে তোমারে ভালা মানাইছে।’ পাটভাঙ্গা শাড়িতে আর গাঁদা ফুলে জমিলা কে দেখাচ্ছিল অপ্সরির মত। মুখে আচল চাপা দিতে দিতে জমিলা বলল কমলামাসি কে , ‘হাসির বাপে আইছে রাইতে। হেই দিছে গ্যান্দা ফুলডারে খুপায় গুইজ্যা।’ রত্নার দিকে তাকিয়ে আবার বলল, ‘তর সোয়ামি আইছে না রাইতে?’
কলপাড়ের সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে হাসতে লাগল। কল্পনামাসি বলল, ‘মাইয়া দুইটার সোয়ামিরা ঘরে থাকে না প্রায়ই। তাই মুখডা পুড়ায়ে থাকে অরা। আইজ দ্যাখ কি সোন্দর ফাগুনের বান ডাকছে অদের মনে।’
types: 
Story