কান্না হাসির দোল দোলানো

গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকা ফিরছে অতনু। ফেরি পারাপার বাস। ঢাকায় একটি গানের স্কুলে মাষ্টারি করে সে।বাড়ি যাবার  খুব একটা সময় পায় না ।তাও প্রতি বছর বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যের মাসের দিকে সে বাড়ি যায়। যাকে বলে কিনা বাংলার মধু মাস। সেই সাথে গ্রামে পঁচিশে বৈশাখ পালন করার একটি চাপা ইচ্ছা মনের মধ্যে থাকে। আজকাল উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের মত তো আর সে হৈ হৈ রৈ রৈ করে চলতে আর পারে না। শুধু তাঁদের আনন্দ দেখে মন ভরে যায়। তবে এই বার অতনু নিয়মের ব্যতিক্রম করেছে। এবার গ্রামে যাবার সময়টি হল শ্রাবণ মাস। ভাইয়ের মেয়ের বিয়ের তারিখ পড়েছে এই মাসে । সুতরাং অগত্যা নিয়ম ভংগ। এক দিক থেকে ভালই হল তাঁর। ঝুম বরষার মধ্যে বাইশে শ্রাবণে রবি ঠাকুরের প্রয়াণদিবস কিভাবে আজকালকার ছেলে মেয়েরা পালন করে সেটা নিজের চোখেই দেখতে পেল সে। বেশ ভাল লাগল অতনুর, এই সব ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের অনুষ্ঠান দেখে। নিজের অতীত দিনের কথা মনে পড়ে গেল তাঁর। আসলেই তো তাঁর জীবনে  পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণের গুরুত্ব অনেক। সেই সব কথা থাক। নিজের মন কে বোঝানোর চেষ্টা করে সে। মনে পড়লেই চোখের মধ্যে বালির কণা কেমন যেন খচ খচ করে।

বাস ফেরিতে উঠতেই দ্রুত নেমে গেল অতনু বাস থেকে বাথরুমের উদ্দেশ্যে। এই হয়েছে এক জ্বালা। বয়স যে বাড়ছে এই তার এক প্রমাণ। বেশ ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হয় তাঁর। আজকাল চোখেও একটু কম দেখে মনে হয়। বাথরুম থেকে ফিরতেই ফেরির এক কিনারায় একটি চল্লিশোর্ধ মহিলাকে দেখে চোখ আটকে গেল তাঁর। এমনিতে অতনু বিয়ে থা করেনি। কোন মহিলার দিকে খুব একটা তাকায় না। কিন্তু আজ কেন যেন চোখ আটকেই গেল ওই মহিলার দিকে। কিছুতেই অন্যদিকে দৃষ্টি দিতে পারছে না সে। দুরের অস্পষ্ট আলোয় সে দেখছে মহিলাটিকে। মনে হচ্ছে মানসী দাড়িয়ে আছে। তাঁর মানসী। একান্ত আপনার। ধুৎ কি যে ছাই ভাবছে সে। একটু যেন লজ্জা পেল অতনু। মানসী তো আমেরিকায় স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে আছে। সে কেন এখানে এই ফেরিতে রেলিঙ এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। ভেবে পায় না সে। কি দেখতে কি দেখেছে সে।

মন মানে না অতনুর। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় সে মহিলাটির দিকে। চোখ ভরে তাকিয়ে থাকে সে। সত্যি তো মানসী।একটু মোটা হয়েছে। সেই এক চেহারা, একহারা গড়ন, একই চুল, নাকের পাশে বসে থাকা সেই একই তিল। তৃষ্ণার্ত চাতকের মত মুখ শুকিয়ে আসতে চায় অতনুর। বুকের ভিতরে যেন হাতুড়ি পিটছে কেউ, সেই কুড়ি বছর আগের পঁচিশে বৈশাখের এক বিকেলের মত। একেই বলে বোধহয় চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে। বুভুক্ষের মত অষ্ফুট স্বরে ডেকে উঠল অতনু, ‘মানসী, মানু।’ পরিচিত ডাক শুনে হঠাৎ চমকে উঠল মানসী। পরক্ষণেই ফিরে তাকাল সে অতনুর দিকে। এক পলকের একটু দেখেই মুখ ঘুরিয়ে ফেলল মানসী তীব্র অভিমানে। অতনু আবার বলে উঠল, ‘আমার দিকে তাকাবে না, মানু?’

-‘কি হবে তাকিয়ে? কি হবে তোমায় ভালবেসে, তোমাকে চেয়ে?’

অতনু চোখে বালির খচ খচানি থেকে রক্ষা পেতে বলল, ‘থাক না ওসব পুরোনো কথা। তা তুমি এখানে? আমেরিকা থেকে কবে এলে?’

-‘এলাম। আসতে নেই বুঝি? বলতে পার এসেছি দেখবার জন্য, কেমন আছ তোমরা অথবা তুমি।’

- ‘তার মানে? তুমি কি একা? নাকি স্বামী বাচ্চাদের সাথে নিয়ে এসেছ? তাঁদের সাথে পরিচয় করিয়ে দাও।’

কথাটা যেন কানে গেল না মানসীর। অতনুর দিকে তাকিয়ে থাকল হা করে। কত স্বপ্ন ছিল তাঁর এই মানুষটি কে ঘিরে এক সময়। কিভাবে পারল সে তাঁকে অন্য পুরুষের সাথে বিয়ে হয়ে যেতে দেখতে। তাহলে কি অতনু মানসীকে কোনদিনও ভালবাসেনি? মানসী চোখের জল আড়াল করে একটু যেন অনুযোগের স্বরেই বলল, ‘তা তোমার বউ কোথায় তাঁকে ডাক একবার। দেখি কেমন মেয়ে বিয়ে করেছ।’

মুখে একটি অভিমানের হাসি ফুটিয়ে অতনু বলল, ‘আ-আমি তো বিয়েই করিনি।’

-‘মানে?’ চমকে উঠল মানসী। একটু থেমে আবার তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, ‘তাহলে সেদিন তোমাকে তোমার মেসে গিয়ে পেলাম না কেন? পালিয়ে গেলে কেন অমন কাপুরুষের মত?’

অতনু চুপ করে থাকল আর ভাবতে লাগল কুড়ি বছর আগের কথা।

অতনু ছিল গ্রামের একটি স্কুলের বাংলার শিক্ষক। বাড়িতে বুড়ো মা-বাবা কে দেখাশোনা আর ভাইবোনদের পড়ালেখার সব খরচ তাঁকেই সামলাতে হত। এই স্কুলের চাকরীতে সবে ঢুকেছিল অতনু সে সময়। সামান্য কয়টা টাকা যা বেতন পেত  তার সবটুকুই চলে যেত বাড়ির খরচের পেছনে। সবখরচ বাদ দিয়ে যা হাতে থাকত তাই দিয়ে শহরের এক কোণে একটি টিনশেড দেয়া মেসে কোনরকমে মাথা গুজে থাকত অতনু। কোন বিলাসিতা করা তো দূরের কথা, বিলাসিতা চিন্তা করার বিলাসিতাও ছিল না তাঁর। তবে শখের মধ্যে যেটি ছিল সেটি হল গান শেখা। শহরের অদূরে এক ওস্তাদের কাছে গান শিখত সে। ভাল গলা, স্কুলের সামান্য বেতন আর গানের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা দেখে  গুরুজী গান শেখানোর কোন দক্ষিণা নিতেন না অতনুর কাছ থেকে। ওদিকে মানসী ছিল মধ্যবিত্ত ঘরের আদুরে মেয়ে। কলেজ ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী ছিল সেই সময়। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে মানসীও গুরুজীর বাসায় গান শিখতে যেত। সেখানেই অতনুর সাথে পরিচয়। সেবার রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী তে একসাথে চিত্রাংগদা নাটকের গান গাওয়ার রিহার্সাল করছিল মানসী আর অতনু।সেখান থেকেই ভাল লাগা শুরু। মানসী প্রথমে অতনুর গানের ও পরে অতনুর প্রেমে পড়ে।  ঠিক যেমন অর্জুনের প্রেমে পড়েছিল চিত্রাংগদা। মানসীর ভাললাগা বুঝতে পেরে অতনু পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠান শেষে গোলাপের পাপড়ি ভরা একটি খাম দেয় মানসীকে। শুরু হয় গান ও প্রেম পর্ব। সেই সাথে ছোট্ট একটি ঘর বাঁধার স্বপ্ন। সেই ঘরের ছাদে বসে গানের আসর চলবে প্রতিরাতে। মানসী আর অতনু মিলে গাইবে জীবনের জয়গান। কিন্তু তাঁদের সেই প্রেমের কথাটি গোপন থাকল না মানসীর বাড়িতে। মানসীর বাবা গোপনে দেখা করলেন অতনুর সাথে তাঁর মেসে। মানসীর জীবন থেকে সরে যেতে অনুরোধ করলেন তিনি।   

-‘কি হল চুপ করে থাকলে কেন? উত্তর দাও।’, মানসী আবার বলে উঠল।

-‘আমি তো পালিয়ে যাই নি। শুধু তোমার বাবার অনুরোধ রেখেছিলাম। তোমার বাবা আমার কাছে তোমার সুখ শান্তি ভিক্ষা চেয়েছিলেন। আমি না করতে পারিনি।’

সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল মানসীর। কুড়ি বছর ধরে এই কথাটিই জানবার ছিল। এবার সে শান্তিতে পথ চলতে পারবে। টলটল চোখে মানসী তাকাল অতনুর দিকে। বলল, ‘সিগারেট ছেড়েছ? নাকি আবার শুরু করেছ?’

-‘সে তো তুমিই ছাড়িয়েছ।’

-‘এখনও কি আগের মত গান বাজনা কর?’

-‘যে গানের  মাধ্যমে তোমাকে পেয়েছি। তা কি ছাড়তে পারি? তবে এখন গান শেখাই। জানো মানু, তোমার আমার মত কত শত মানসী -অতনু আছে আমার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে। কারোর বিয়ের নেমন্ত্রন পাই আবার কারোর পাই না।’

মানসীর চোখ আবার জলে ভরে উঠল। মনে হল কানে বাজছে অতনুর গাওয়া একটির পর একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত। কি অসাধারণ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত অতনু। আর প্রতি কথার ফাঁকে ঝরে পড়ত রবি ঠাকুরের গান-কবিতা-গল্প বা উপন্যাসের কোন লাইন। বন্ধুরা তো তাঁকে চলন্ত রবি টেপ-রেকর্ডার বলে ডাকত। আজও কি সেই একই ভাবে রবিঠাকুর আওড়ায় অতনু? খুব জানতে ইচ্ছে করে মানসীর। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অতনুর সেই প্রথম প্রেম নিবেদনের স্মৃতি। হঠাৎ চকিত চাহনিতে মানসী অতনুকে বলে, ‘সেই প্রথম চিঠিটির কথা মনে পড়ে তোমার অতনু?’

অতনু চশমার কাঁচ মুছতে থাকে। হাত থেকে চশমাটি নিজের হাতে টেনে নিয়ে চশমার কাঁচ মোছার বাকি কাজটুকু করতে থাকে মানসী। অতনু বলে ওঠে, ‘হুম খুব মনে আছে। গোলাপের পাপড়ি ভরা একটি খামের ভেতর একটি চিঠি আমি লিখেছিলাম। তাতে লেখা ছিল-

“ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে. 

আমার নামটি লিখো-- তোমার. মনের মন্দিরে। 

আমার পরানে যে গান বাজিছে.

তাহার তালটি শিখো-- তোমার. চরণমঞ্জীরে॥”’

মানসী চশমাটি ফেরত দিয়ে আবৃত্তির ঢঙ্গে বলে ওঠে, ‘আর আমি উত্তরে লিখেছিলাম-

“তোমার অভিসারে যাব অগম পারে

চলিতে পথে পথে বাজুক ব্যাথা পায়ে”।’

কেঁদে ওঠে মানসী। কান্না বিজড়িত কন্ঠে বলতে থাকে, ‘শুধুই ব্যাথাই পায়ে বাজল, তোমার সাথে অভিসার আর হল না।’

-‘তারপর, তোমার কথা তো কিছুই বলছ না।’, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অতনু শুধায় মানসীকে।

-‘তার কি আর পর আছে।

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু,

বিরহদহন লাগে।’

 

অতনু উত্তর দেয়,

‘তবুও শান্তি, তবু আনন্দ,

তবু অনন্ত জাগে ॥’

সেই অতীত স্মৃতি আর পুরোনো নষ্টালজিয়া পেয়ে বসেছে অতনু আর মানসী কে এই চলন্ত ফেরির এক কোণে এত বছর পরে। অতনু হঠাৎ মানসীর হাত দু’টো ধরে বলে ওঠে, ‘আমাদের যে দিন গেছে তা কি একেবারেই গেছে কিছুই কি নেই তার বাকি?’ কথাটি বলে অতনু ভাবল সে এটা কী বলল।  অন্যের বিবাহিত স্ত্রী কে তো সে এই কথা বলতে পারে না।

কিছুক্ষন মানসী অতনূর দিকে তাকিয়ে থাকল এ কথা শুনে।শাড়ির আচলে মুখ চাপা দিতে দিতে মানসী বলল, ‘বাইশে শ্রাবণ যে দিন আমি তোমার মেসে গিয়েছিলাম এক কাপড়ে, সেদিন তুমি একটি চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিলে মনে আছে? মনে না থাকলে মনে করিয়ে দেই।’

মনে পড়ল অতনুর এই চিঠিটির কথা। কুড়ি বছর আগে তাঁর মেসের দরজার তালার সাথে লাগিয়ে অতনু মানসীর জীবন থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। অন্য কোন পুরুষ কে বিয়ে করবে না বলে মানসী এক কাপড়ে চলে এসেছিল তাঁর কাছে পরম নির্ভরতায়। কিন্তু অতনু সেই দিন তাঁর এই অসচ্ছল জীবনের সাথে মানসী কে জড়াতে চায়নি। তাই ফিরিয়ে দিয়েছিল মানসী কে।

একটু নিজেকে সামলে মানসী আবার বলল, ‘তুমি লিখেছিলে-

“তোমায় নতুন করে

পাব বলে হারায় ক্ষণে ক্ষণে।”

আমায় ক্ষমা কর মানু।”’

 

কথাটি শেষ করে মানসী ছুটে চলল তাঁর বাসের দিকে কাঁদতে কাঁদতে। শুধু মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘ফেরি ঘাটে ফিরেছে। আমি বাসে উঠলাম। তুমি সাবধানে থেক। ভাল থেক।শুধু একটি কথা জেনে রেখ, তোমার স্মৃতি আর স্পর্শ আমাকে বিয়ের পরও সংসারের বাঁধনে জড়াতে দেয় নি।’

মানসী চলে গেল বাসে। অতনু কিছুক্ষন দাড়িয়ে থাকল। তারপর ছুটল আবার বাথরুমের দিকে। বাসে ফিরে এসে দেখল তাঁর সীটের উপর গোলাপের পাপড়ি ভরা একটি খাম। তার ভিতরে একটি চিঠি। মানসীর হাতের লেখা, ‘প্রতি বছর আমি তোমার মেসের কাছে যাই বাইশে শ্রাবণ এর দিনে, সেদিনের সমস্ত ঘটনা জানব বলে। কিন্তু তোমাকে পাইনি। আজ তোমাকেও পেলাম আর সব প্রশ্নের উত্তরও পেলাম। এবার আমার মুক্তি আলোয় আলোয়। রবি ঠাকুরের ভাষায় তোমার কথার জবাবে বলি,

“আমার বেদনা আমি নিয়ে এসেছি,

মূল্য নাহি চাই যে ভালোবেসেছি,

কৃপাকণা দিয়ে  আঁখিকোণে ফিরে দেখো না ॥”’


types: 
Story

Facebook comments