একদিন বৃষ্টি বিলাসে

Primary tabs

যাহ! অফিসে যেতে আজ দেরী হয়ে গেল অহনা। এমন অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে কাল রাত থেকে যে থামার নাম গন্ধ নেই, বাইক বের করতে করতে সুব্রত অহনা কে বলল।

বৃষ্টি তো প্রতিদিনই হচ্ছে। তুমি না বৃষ্টি খুব পছন্দ করতে। মাঝে মাঝে বলতে, বৃষ্টির দিনে চাই বৃষ্টি বিলাস ভুলে গেছো সেই দিনের কথা?, অহনা দুষ্টুমিভরা চাহনিতে বলতে থাকে সুব্রত কে।

প্রায় প্রতিদিনই ঠিক অফিসে যাবার আগমূহুর্তে বৃষ্টি শুরু হয়। বাইকে যেতে যেতে ভিজে একাকার অবস্থা। যদিও একটি রেইনকোর্ট আছে তাঁর। কিন্তু সেটি খুব একটা পানি প্রবেশ আটকাতে পারেনা। সবচেয়ে বিপত্তি হয় সেই সময়, যখন বাইক চালাতে চালাতে পা নামাতে হয় রাস্তায় জমে থাকা পানির মধ্যে। তখন জুতার ভিতরে পানি ঢুকে যায়। সারাদিন অফিসে এসির মধ্যে ভেজা জামা-কাপড়ে ভেজা জুতা-মোজা পড়ে থাকা রীতিমত এক অত্যাচার। প্রায়ই ঠান্ডা লেগে যায় সুব্রতর। আজকেও বোধহয় সেটির ব্যাতিক্রম হবে বলে মনে হচ্ছে না। তার উপর আজকে বর্ষা উপলক্ষ্যে সেলস প্রমোশনের বিশেষ অফার নিয়ে কনফারেন্স হওয়ার কথা রয়েছে অফিসে। তাও আবার সুব্রত যে প্রোডাক্টটি নিয়ে কাজ করে সেই প্রোডাক্টের সেলস প্রমোশন নিয়ে আলোচনা।

যে মানুষটিকে নিয়ে এত কথা বলছি তাঁর পরিচয় টি এইবার বলে দেয়া প্রয়োজন। সুব্রত একটি বেশ নামকরা কোম্পানিতে সেলস প্রমোশন অফিসার হিসাবে কাজ করছে। বেতন খুব একটা আহামরি কিছু পায় না। যদিও প্রোডাক্ট বিক্রি করতে পারলে তার একটি কমিশন সে পায়।  এছাড়া কোম্পানি তাঁদের নিজেদের স্বার্থে মানে প্রোডাক্ট বিক্রির স্বার্থে একটি বাইক কিনে দিয়েছে তাঁকে স্ত্রী অহনা আর মা-বাবা এই নিয়ে সুব্রতর সুখের সংসার। আজ তাঁর প্রোডাক্টের উপরই কনফারেন্স অথচ আজই কিনা অফিসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইক নিয়ে ছুটে চলল সুব্রত অফিসের পানে। বেশ ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে এখনও। সুব্রতর মাঝে মাঝে মনে হয় এমন বৃষ্টির দিনে ঘরের সব আলো বন্ধ করে দিয়ে বৃষ্টি দেখা আর ধোঁয়া ওঠা গরম গরম খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা খাওয়ার মজাই আলাদা। অফিসে যেতে মন চায় না। মাঝে মাঝে বৃষ্টি বিলাস করতে ইচ্ছা হয়। চাকরিতে ঢোকার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাই বলেছিলেন, শোন সুব্রত, চাকরি মানে হলো গিয়ে চাকরগিরি করা। মন দিয়ে সেই চাকরগিরি করার চেষ্টা করবা। কথাটি শেষ করেই ফিক করে হেসে দিয়েছিলেন সেই বড় ভাই।  

কথাটির মর্মার্থ সেদিন কিছু না বুঝলেও আজ ঠিকই বুঝতে পারছে সুব্রত। যাইহোক কোনরকম ঝামেলা ছাড়া ঠিক সময়মত অফিসে পৌছিয়ে গেল সে। কিন্তু কথায় আছে না যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। সেরকম অফিসে ঢুকতে ঢুকতেই এম ডি সাহেবের সাথে দেখা হয়ে গেল তাঁর। সুব্রতকে এরকম কাঁকভেজা অবস্থায় দেখে তিনি বলে বসলেন, এই জন্যই তো সুব্রত তোমার প্রোডাক্ট বিক্রি হতে চায় না। কি পোষাক পরিচ্ছেদের অবস্থা তোমার! জুতা শাইন করা নেই, চুল গুলো এলমেলো আবার গলায় টাই পর্যন্ত বাধোনি। কি যে হবে তোমার!’ এম ডি সাহেবের গলার আওয়াজ শুনে কোত্থেকে এইচ আর ম্যানেজার এসে হাজির হলেন। তারপর আমি দেখছি স্যার এই জাতিয় কথা বলে সুব্রত কে এম ডির রোষানল থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। সুব্রত যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু বিধি বাম! এইচ আর ম্যানেজার আর সুব্রতর ইমিডিয়েট বস মিলে সুব্রতকে যা শোনাল তাতে সুব্রতর মনে হল যে সে যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। তীব্র অপমান আর বিপর্যস্ত অবস্থায় সুব্রত তাঁর সেলস প্রমোশনের প্রেজেন্টেশনটা শেষ করল সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সামনে। এতকিছুর পরও ভাল খবর এই যে, সুব্রতর তৈরি করা প্রেজেন্টেশন আর তাঁর উপস্থাপন অফিসের বড় কর্তাদের বেশ পছন্দ হয়েছিল। যদিও এর পুরো ক্রেডিটটি নিলেন সুব্রতর ইমিডিয়েট বস। যাক তাতে সুব্রতর কোন দুঃখ নেই। সে ভাবতে থাকে চাকরিটা টিকে থাকলেই হলো। পরিবার পরিজন আত্মীয় স্বজন নিয়ে সাধারণ জীবন যাপন করতে চায় সে। কর্পোরেট কালচার বা পলিটিক্স তোলা থাক অফিসে আর বাড়িতে থাকুক অবারিত শান্তি, অনাবিল আনন্দ বৃষ্টির রিম ঝিম শব্দ।

অফিসে কাজের ফাঁকে কাঁচের জানালার ভিতর দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে হঠাৎ যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল সুব্রত। বৃষ্টির রিম ঝিম শব্দ কানে বাজতে লাগল। মন চলে গেল পাঁচ বছর পেছনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালিন সময়ে নুরু ভাইয়ের চায়ের দোকানে। এরকম এক বর্ষায় বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে অহনার হাত ধরে ছুটতে ছুটতে আশ্রয় নিয়েছিল নুরু ভাইয়ের চায়ের দোকানে। বেশ বড় একটি চায়ের দোকান। মাথার উপর টিনের চাল দেয়া। বৃষ্টির ফোটা টিনের চালের উপর পড়ে এক অদ্ভুত জলতরঙ্গের সুরধ্বনি সৃষ্টি করেছিল। অহনার হাতটি তখনও সুব্রতর হাতের মাঝে পরম নির্ভরতা খুঁজে নিয়েছিল। বেশ একটা অন্যরকম ভাললাগা তৈরি হয়েছিল সেদিন। মনে মনে বুঝেছিল সুব্রত, বৃষ্টি বিলাস কাকে বলে।

অফিস প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সুব্রত অফিস থেকে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগল। সময় অফিসের একাউন্টস অফিসার কাসেম সাহেব সুব্রতর দিকে এগিয়ে এসে বললেন, সুব্রত সাহেব, আজ এই বৃষ্টিতে বাসায় যাবার জন্য রাস্তায় কিছু পাব বলে তো মনে হয় না। আমাকে কি একটু লিফট দিতে পারেন? কাসেম সাহেব বেশ ভদ্র গোছের ভাল মানুষ। তাঁকে না  বলতে ইচ্ছা হয় না সুব্রতর। কিন্তু আজ আবার তাঁর টিউশনি আছে। সে যাবে অন্যদিকে। অফিসের টাকায় সংসার চলে ঠিকই কিন্তু ভাল ভাবে চলে না। তাই বাড়তি উপার্জনের জন্য এই টিউশনি। তাই কাসেম সাহেব কে অন্য একটি জরুরি কাজের দোহায় দিয়ে এড়িয়ে গেল সুব্রত। কাসেম সাহেব হয়ত একটু মনক্ষুন্ন হয়েছিল। কিন্তু কিছু করার নেই তাঁর। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষদের এই আরেক সমস্যা। সকল কে খুশি রাখতে পারে না ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও।

বাইক নিয়ে টান দিল ছাত্রের বাসার উদ্দেশ্যে। বৃষ্টি এখন আর নেই। তাই রেইনকোর্ট পড়বার কোন প্রয়োজন দেখল না সুব্রত। ছাত্রের বাসার কাছাকাছি আসতেই এক মস্ত বড় পাজেরো গাড়ি তাঁর বাইকের পাশ দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে গেল। সেই সাথে ছিটিয়ে দিয়ে গেল বৃষ্টি ড্রেনের ময়লা মাখা কাদা পানি। একে তো ভেজা জামা কাপড় পড়ে আছে সে। তার উপর জামা কাপড় কাদা দুর্গন্ধময় পানিতে একাকার হয়ে গেল। ছাত্রের বাসায় এই অবস্থায় যাবে কিনা চিন্তায় পড়ে গেল সুব্রত। শেষপর্যন্ত ঠিক করল, এত দূর যখন চলে এসেছে তখন যাবে। একটি দোকান থেকে কিছু টিস্যু কিনে নিয়ে কোনরকমে জামা কাপড় থেকে কাদা পানি মুছে ছাত্রের বাসায় পৌছিয়ে গেল সে। ছাত্রের বাসায় গিয়ে দেখে সে এলাহি কান্ড। বাসার ভেতরে অনেক মেহমান। সবাই বেশ পরিপাটি বেশ ভুষায়। তার মধ্যে তাঁর এই কাদা পানি মাখা অবস্থায় অস্বস্তি লাগতে লাগল। লজ্জায় সে মরে যাচ্ছিল। বাবা বলেছিলেন একদিন, ধানক্ষেতের মধ্যে যদি একটি পাট গাছের মত অর্থকরি ফসলের গাছও থাকে তারপরও সেই পাটগাছ কে আগাছাই বলা হয়।তাঁর অবস্থা এখন সেই পাটগাছের মতই। ছাত্রের মা সুব্রতকে দেখে একটি রুমে নিয়ে গেলেন। তারপর কাজের মহিলাকে দিয়ে কিছু খাবার নিয়ে আনিয়ে তাঁকে খেতে দিয়ে বললেন, থাক বাবা আজ আর পড়াতে হবে না আজ তোমার ছাত্রের জন্মদিন। সুব্রত মনে মনে ভাবে, ছাত্র আজ পড়বেনা সেটা আগে বললেই তো হত। তাহলে তাঁকে এত কষ্ট করে পড়াতে আসতে হত না। কাসেম সাহেব কে লিফট দিতে পারত আর বাড়ি ফিরে অহনা কে সময় দিতে পারত। আসলে কে ভাবে কার কথা এই জগতে!

ওই রুমে বসে খেতে খেতে কিছু কথা তাঁর কানে ভেসে আসতে লাগল। সে যে আড়িপেতে কথাগুলো শুনছিল তা নয়। বরং কথাগুলোই ভেসে ভেসে সতস্ফুর্তভাবে তাঁর কানে ঢুকছিল। কাজের মহিলা টি ছাত্রের মাকে বলছিল, বেগম সাব, আইজ একটু তাড়াতাড়ি ছাইরা দিয়েন। ঘরত গিয়া রান্ধন লাগব। বাপ-ছেলে না খাইয়া আছে। আর কিছু ট্যাহা দিয়েন চাইল কিনন লাগব। ঘরের মইধ্যে পানি উইঠ্যা চাইল ডাইল সব ভিইজা গেছে।

ছাত্রের মা কড়া গলায় বলে উঠল, দেখিস না, আজ বাসায় কত মেহমান। আজ তাড়াতাড়ি যেতে পারবি না। আর মাস শেষ না হতেই টাকা দিব কেমন করে?’

-‘আমার সোয়ামির খুব জ্বর উডছে। আর থিক্কা থিক্কা হাপানির টান উডে। মাটির কাটার কাম করে তো হ্যায় অহন বর্ষার সময় মাটি কাটার কাম বন্ধ। তাই কিছুদিন ট্যাহার জন্য রিসকা চালাইছিল। বুইড়া শরির ধকল সামলাইতে পারে নাই। বিছানায় পইরা গেছে। কিছু ট্যাহা দেওনই লাগব বেগম সাব। বেতন থন কাইট্যা লইয়েন।

-‘যাও যাও কাজ করোগে যাও। দেখি তোমার সাহেবের সাথে কথা বলে কি করা যায়, ছাত্রে মা বললেন।

কারো বাসায় এতটুকু খাবার নেই আর কারো বাসায় অঢেল খাবার হয়ত নষ্ট হচ্ছে। এই সব কথা চিন্তা করে সুব্রতর গলা দিয়ে খাবার নামতে চাচ্ছিল না। তবুও ভদ্রতার খাতিরে সব খেয় নিল সে। ছাত্র আর ছাত্রের মায়ের কাছ থেকে দ্রুত বিদায় নিয়ে বাসা উদ্দেশ্যে রওনা দিল সুব্রত। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম হয়েছে এখন। বৃষ্টি হলে এই এক সমস্যা। রাস্তায় জলজট আর যানজট যেন প্রতিযোগিতা করে যাই হোক বেশ ভাল ভাবেই জ্যাম ঠেলতে ঠেলতে বাসায় পৌছে গেল সুব্রত শরিরে এত টুকু শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। বাসার সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সে শুনতে পেল কোন এক ফ্ল্যাটের একটি বাচ্চা আবৃতি করছে রবি ঠাকুরের একটি কবিতা,

                                    “মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়

আড়ালে তার সূর্য হাসে

হারা শশির হারা হাসি

অন্ধকারেই ফিরে আসে।

সিড়িতে দাড়িয়ে কিছুক্ষন আবৃতি শুনল সুব্রত। কবিতাটি মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে আবার সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল সে। আর ভাবতে লাগল, আর চাই না বৃষ্টি বিলাস। কবে মেঘ চিরে আসবে সূর্যের হাসি তাঁদের মত মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্তদের জীবনে?

types: 
Story