শ্রমের মূল্য

থাটা বসকে পাড়তেই প্রায় ধমকের সুরে বললেন, ‘আহ! রাজিব, মাত্র তো প্রজেক্টটা শুরু করলে তুমি। এরই মধ্যেই ছুটি লাগবে তোমার? কাজ়ে কর্মে মন দাও। আর ওসব নিয়ে কথা বাড়ানোর মত সময় আমার নেই।’

থতমত খেয়ে রাজিব আমতা আমতা করে বলেই ফেলল, ‘নতুন বিয়ে করেছি স্যার, বিয়ের সময় তো তেমন কোন ছুটি কাটাই নি। তাই একটু বেড়াতে যেতাম।’

হাত নেড়ে প্রায় তাড়িয়ে দেবার ভঙ্গিতে বস বলে উঠলেন, ‘কনষ্ট্রাকশন লাইনে একটু ছুটি কম। সেটাতো তোমার জানার কথা। যাও যাও কাজে মন দাও। আর ভাল না লাগলে বলে দিও।’

বসের রুম থেকে বের হয়ে আসতে আসতে শুধু মীরার কথা মনে পড়ছে। প্রায় এক বছর হতে চলল তাদের বিয়ে হয়েছে। অফিসের কাজের চাপে আর সংসারের টানাটানিতে কোথাও একটু ঘোরার অবকাশ পায়নি তাঁরা। সংসারের খরচ থেকে একটু একটু করে বাঁচিয়ে কিছু টাকা জমিয়েছে মীরা। আজ সকালে রাজিব যখন অফিসে যাবার জন্য বের হচ্ছিল তখন মীরা দরজার কাছে দাড়িয়ে রাজিবের পথ আগলে তাঁকে দু’তিন দিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সমুদ্র দেখতে নিয়ে যাবার কথা বলেছিল। রাজিব জবাব দিয়েছিল, ‘আমার মনে আছে মেমসাহেব। আজকে বস কে অবশ্যই বলব ছুটির কথা।’ মীরা মুখে মিটিমিটি হাসি ঝুলিয়ে, দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরে রাজিব কে বলেছিল, ‘আমাকে ঘুরতে নিয়ে চলেন জনাব, আপনার জন্য সারপ্রাইজ আছে। রাজিবের বারবার জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও বলেনি মীরা সারপ্রাইজটা কী।’

নিজের চেয়ারে বসতেই অফিসের সিনিয়র কলিগ আমজাদ সাহেব পান খাওয়া দাঁত বের করে একটি বাঁকা হাসি দিয়ে বোঝানো শুরু করলেন রাজিব কে, ‘ভাই, দেখেন চাকরিটাই আসল। ছাপোষা মানুষ আমরা,  আমাদের কি অত বিলাসিতা করলে চলে? ওসব মধুচন্দ্রিমা টধুচন্দ্রিমা না করে কাজে কর্মে মন দেন। দেখেন নাই গত বছর বড় সাহেব আমার কাজে খুশি হয়ে আমাকে মালয়েশিয়া থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসল। আপনি বড় স্যারদের মন জয় করতে পারলে আপনিও এই সুযোগ পাবেন।’ খুব বিরক্তি নিয়ে আমজাদ সাহেবের কথাগুলো শুনছিল রাজিব। আর মনে মনে গালি দিচ্ছিল, ‘শালার আমজাদ, তুই তো স্যারদের কে তেল দিয়ে দিয়ে সুযোগটা নিয়েছিস। আর সাপ্লায়ারদের বিল আটকে রেখে তাদের টাকায় মালয়েশিয়া থেকে শপিং করেছিস। আর এখন শোনাচ্ছিস নীতি কথা।’

রাজিব এই সব কথার হাত থেকে বাঁচতে বিরস মুখে কম্পিউটারে নতুন প্রজেক্টের মালামালের এস্টিমেট করতে লাগল।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর যে সুন্দর, ছিমছাম অফিসের স্বপ্ন দেখেছিল রাজিব। সে সব কিছুই ভাগ্যে জোটেনি তাঁর।  সকালে ঠিক নয়টাই অফিসে ঢুকতে হয়, নইলে তিন দিন লেট করলে একদিনের মাইনে কাটা যায়। সেটা কোন সমস্যা না।শৃংখলা মেনে অফিস আসতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই অফিস থেকে বের হওয়ার সময় বাধে যত গন্ডগোল। এ কাজ সে কাজ এসে জমতে থাকে সব তাঁর টেবিলে। সব মিলে ছয়টার অফিস শেষ হয় রাত নয়টায়। অতিরিক্ত কাজের জন্য ওভারটাইম তো নেই-ই উপরন্তু ওভারটাইমে অতিরিক্ত কাজ না করলে চাকরীচ্যুত করবার হুমকিও আছে।সে যাই হোক সারা দিন একরকম জোর করেই অফিসে নিজেকে আটকিয়ে রাখল রাজিব। আর ভাবতে লাগল এই এক বছরের বিবাহিত জীবনে মীরা খুব বেশি কিছু চায় নি তাঁর কাছে। এই একটি আবদার করেছিল মীরা, সেটাও সে মেটাতে পারলনা। অথচ মীরাকে কথা দিয়েছিল সে।

অফিস থেকে ঠিক ছয়টায় বেরিয়ে পড়ল রাজিব। যদিও আমজাদ সাহেব আড়চোখে তাঁর বেরিয়ে যাওয়া দেখছিল। রাজিব বুঝতে পারছিল, এখনি আমজাদ সাহেব বসের রুমে গিয়ে রাজিবের তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার খবরটা দিবে। আমজাদ সাহেবরা যতই দেখুক আর বসদের কানভারি করুক না কেন, আজ রাজিবের আর কিছুই ভাল লাগছেনা।বাড়ি ফিরে মীরাকে সবকিছু খুলে বলল সে। মীরার মনটা খারাপ হলেও রাজিব কে বুঝতে দিল না। শুধু সারপ্রাইজটা দিল রাজিবকে যে তাঁরা বাবা-মা হতে চলেছে। শুনে রাজিবের তো খুশি আর ধরে না। সারাদিনের ক্লান্তি আর মন খারাপ লাগা এক নিমিশেই উধাও হয়ে গেল কিছুক্ষনের জন্য। কিন্তু পরের ক্ষনেই আবার মনে পড়ল মীরা কে এই এক বছরে কোথাও না নিয়ে যেতে পারার কষ্ট।

রাতে মীরা রাজিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগল, ‘এখন অবশ্য এই সময় কোন জায়গায় মুভমেন্ট না করাই ভাল। বাবু একটু বড় হলে আমরা তিনজন মিলে সমুদ্র দেখতে যাব-ঠিক আছে? তুমি আর এ নিয়ে মন খারাপ করো না।’

ধীরে ধীরে একেকটি মাস গড়িয়ে যেতে লাগল। বাচ্চাও মীরার শরীরের ভেতর বড় হতে থাকে। এ সময় মীরার দেখাশোনা করার লোক দরকার। তাই মীরার বাড়ি থেকে মীরার মা-বোন এসেছে। তারা যতটুকু পারছে মীরা কে যত্ন আত্তি করছে। কিন্তু মীরা চায় রাজিবের সংগ। আর বেচারা রাজিব অফিসের যাতাকলে নিজের শ্রম-মেধা-কর্মদক্ষতা দিয়ে টিকে থাকার লড়াই করে চলেছে। হঠাৎ একদিন বাসা থেকে ফোন এল রাজিবের মুঠোফোনে। বেশ কিছু টাকা দরকার । এখুনি মীরা কে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।বাসার সবাই মীরাকে নিয়ে আর তাদের বেড়াতে যাবার টাকা ও মীরার আরও কিছু জমানো সব টাকা নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছে।রাজিব যেন আরও কিছু টাকা নিয়ে সোজা হাসপাতালে চলে আসে। আরও টাকা লাগবে। ডাক্তার আপা বলেছেন, মা ও সন্তানের অবস্থা নাকি ভাল নয়। রাজিম এসব শুনে তাড়াতাড়ি বসের কাছে গেল। বস মিটিং এ আছেন বিদেশি ডেলিগেটদের নিয়ে। এখন তাঁর সাথে দেখা করা যাবে না। নিষেধ সত্ত্বেও সে মিটিং রুমে ঢুকে বস কে আড়ালে ডেকে নিয়ে সবকিছু জানাল। বস জি, এম সাহেবের সাথে কথা বলতে বলে মিটিং এ আবার ঢুকতে ঢুকতে বিড় বিড় করে বলতে লাগলেন, ‘যত্তসব ফালতু ঝামেলা। কাজের নামে খোজ নেই খালি টাকা দাও-ছুটি দাও।’ এসব কথা শুনে রাজিবের পিত্তি জ্বলে উঠল।

যাই হোক দরকার যখন তার তখন সে ধীরে ধীরে জি এম সাহেবের রুমের দিকে পা বাড়াল। জি এম সাহেব সব শুনে হেসে বললেন, ‘রাজিব সাহেব, বাচ্চা নিচ্ছেন ভাল কথা। তা একটু প্লানিং করে নিলে ভাল হত না? শুনলাম দু’দিন আগে তো কোথায় যেন ঘুরতে যাবার কথা বলছিলেন, সেই টাকা দিয়েই ব্যবস্থা করেন। আর বড় সাহেব ব্রাজিলে গিয়েছেন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে। এখনতো তাঁর অনুমতি ছাড়া তো টাকার ব্যবস্থা করতে পারব না। আপনি বরং পরে আর একদিন আসুন।’ 

এ কথা শুনে মা্থায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল রাজিবের। তাঁদের কর্মচারীদের ছুটি দিতে বড় সাহেবদের এত ওজর-আপত্তি আবার দরকারে টাকা ধার চাইতে গেলে সাহায্য পাওয়া যায়না। অথচ তাঁদের মত হাজারও মানুষের ঘামে ভেজা কষ্টের টাকায় তিনি গিয়েছেন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে। দুম করে মুখের উপর রেজিগনেশন লেটার দিয়ে রাজিব বেরিয়ে পড়ল অফিস থেকে। এক বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে ছুটল হাসপাতালের দিকে। হাসপাতালে গিয়ে দেখে তাঁর পরিবারের লোকজন মুখ শুকনা করে হাসপাতালের বারান্দায় পায়চারি করছে। একটু পরে ডাক্তার শাহানা এসে বললেন, ‘বাচ্চাটিকে আমরা বাঁচাতে পেরেছি, কিন্তু………’ ডাক্তার আপা আর কথা শেষ করলেন না। রাজিব প্রায় চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু কি? ডাক্তার আপা।’ ডাক্তার শাহানা রাজিবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আই এম সরি, মিষ্টার রাজিব।’ রাজিবের মাথা শূন্য হয়ে গেল। ভাবতে পারছিল না কি করবে বা কিভাবে মানুষ করবে এই বাচ্চা কে। বারবার মীরার মুখটি মনে পড়ছিল। মীরার খুব ইচ্ছা ছিল সমুদ্র দেখবার। মীরার কণ্ঠস্বর যেন শুনতে পারছিল ‘আমাকে ঘুরতে নিয়ে চলেন জনাব, সারপ্রাইজ আছে।

সত্যিই মীরা সারপ্রাইজ দিল তাকে। মীরা কে সমুদ্র দেখাতে পারে নি রাজিব। সেই যন্ত্রণাটি কুরে কুরে খাচ্ছে রাজিব কে। ধীরে ধীরে ছোট্ট মেয়েটিকে বুকে নিয়ে সামলে উঠল রাজিব সব ধাক্কা কয়েকদিনের মধ্যেই। প্রতিজ্ঞা করেছে আর চাকরি নয়, ব্যবসা করবে সে।তাঁর প্রতিষ্ঠানে কোন কর্মচারীর প্রতি যেন অবিচার না হয় সেটার দিকে নজর রাখবে সে। চাকরিতো আগেই ছেড়ে দিয়েছে সে। ওরা শেষ মাসের বেতনটা পর্যন্ত দেয় নি তাঁকে। চাকরি নাকি বিধিসম্মতভাবে ছাড়া হয় নি। অথচ এই অফিসে সে রাত কে রাত দিন কে দিন অমানুষিক পরিশ্রম করেছে। সেই শ্রমের মূল্য সে পেয়েছে মীরা কে হারিয়ে, জরুরি টাকার সহযোগিতা না পেয়ে এমনকি শেষপর্য ন্ত শেষ মাসের মাইনেটা না পেয়ে। কী বিচিত্র এই জগৎ! আর কী অসাধারণ শ্রমের মূল্য!!         

types: 
Story

Facebook comments