সুন্দরের খোঁজে সিলেটে

একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী।

ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবনী॥ 

 প্রতিটি মানুষের কাছে সবচেয়ে সুন্দরতম মুখটি হল তাঁর মায়ের মুখ। আর সবচাইতে সুন্দর প্রতিচ্ছবি হল তাঁর মাতৃভূমির প্রাকৃতিক দৃশ্য। আর সে দৃশ্য যদি হয় শস্য-শ্যমলা-সুজলা-সুফলা ছবির মত সুন্দর তাহলে তো কথাই থাকে না। সেই রূপ দেখেই মন ভরে যায়, প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ঢাকা শহর কে দেখলে কারোরই বোঝার উপায় নেই যে বাংলাদেশের সৌন্দর্য্যের গভীরতা কতখানি। প্রতিদিনকার যানজট আর সারাদিনের কাজের চাপে মাঝে মাঝে মনের ভেতরটা কেমন যেন শুকিয়ে যায়, একটু যেন হাপিয়ে উঠি। মনে হয় ফুসফুসটাতে অক্সিজেনের সরবরাহ ঠিকমত হচ্ছেনা। তাই বুক ভরে শ্বাস নিতে আর প্রকৃতির কোলে মিশে যেতে মাঝে মধ্যে  বেরিয়ে পড়ি বাংলার রূপ দেখতে। বলা যায় বেরিয়ে পড়তে হয়। এই যাত্রায় কখনও আমি একা আবার কখনও কখনও সাথে থাকে খুব কাছের বন্ধু-বান্ধব। সেরকমই বেশ কিছুদিন আগে জমজমাট কাজের ব্যস্ততাকে পিছু ফেলে বেরিয়ে পড়েছিলাম সিলেটের উদ্দেশ্যে আমরা কয়েক তরুণ। অপলক দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলাম লালাখালের নীল জলরাশি, ঘন সবুজ জংগলের নিচে স্বচ্ছ পানি সমৃদ্ধ রাতারগূলের জলবন আর জাফলং এর মারি নদীর বিশালতা।

লালাখালঃ   প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি হল লালাখাল। কী অপরূপ! কী তার শোভা!! মনের অজান্তে গুন গুন করে গেয়ে উঠতে হয়-কী শোভা কী ছায়া গোকী স্নেহ কী মায়া গো।ধুসর পাহাড়ের পাদদেশে নীলনয়না নারীর চোখের মত এক চিলতে স্বচ্ছ নীল পানি। একটি খাল। দুই পাশে ঢালু পাড়। সেই পাড়ে রয়েছে অসংখ্য সবুজ গাছ-গাছালী আর পাখ-পাখালী। যেন শিল্পীর তুলিতে আকা সবুজের হাতছানি। মাঝে বয়ে চলছে নরম-কোমল-স্নিগ্ধ নীল জলরাশি। শুধুই কি নীল? মনে হয় নীল আর সবুজের এ যেন অপূর্ব মেলবন্ধন। সেই রঙের নাম হয়ত চিত্রশিল্পীগণ বলতে পারবেন। সেই রঙে আমার চোখ ধাধিয়ে গেল। চোখও যেন পলক ফেলে সময় নষ্ট করতে চায় না-গো গ্রাসে গিলতে থাকে সেই মোহনীয় রূপ। চোখে লেগে থাকা সব রঙ যেন ছড়িয়ে গেল তনু-মনে-কর্মে-মর্মে। স্বচ্ছ জলরাশির নিচে সোনালী রঙের বালুকণা যেন সেই রূপকে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। এই হলো লালাখালের রূপ।

এখানে যাবার জন্য বেশি কষ্ট করতে হবেনা। শুধু মনের ঐকান্তিক ইচ্ছাই যথেষ্ঠ। সিলেটের অদূরে জাফলং যাবার পথে সারিয়াঘাট নামে একটি সুন্দর জায়গা আছে। ব্যাস, বাস থেকে নেমে পড়লেই হল। পাওয়া যাবে অপার সৌন্দর্য্যের লালাখাল। পুরো লালাখালটি ঘুরতে হলে একটি নৌকা ভাড়া করতে হবে। নৌকার মাঝিই নীল জলরাশির বুক চিরে সম্পূর্ণ খালটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবেন।

জাফলংঃ সিলেটে পা দিলেই সবার মনে প্রথম জাফলং এর নাম মনে আসে। বাংলাদেশের একদম সীমান্তবর্তি এলাকা হল এই জাফলং। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার একটি জায়গা এটি। দু’পাশের উচু উচু পাহাড় আর তার মাঝে বয়ে চলেছে বরফগলা স্বচ্ছ নদী ‘মারি’। এই নদীর চারপাশে শুধুই পাথর আর পাথর। ছোট পাথর, বড় পাথর, নুড়ি পাথর আরও কত রকমের ও কত শত বর্ণের পাথর যে আছে তার ঠিক নেই। নানা রঙের, নানা সাইজের পাথর নদীর জলে ভেসে ভেসে আসছে ভারত থেকে। যেমন স্বচ্ছ নদীর পানি তেমনি তার শোভা বাড়াচ্ছে সবুজ পাহাড় আর নানা রঙের পাথরের সমাহার। মাঝে মাঝে আমি কান পেতে রই। শুনতে পাই পাথর আর পানির স্রোতের এক অপূর্ব সুর ঝঙ্কার। মনে হয় প্রকৃতির নিজস্ব রং, ঢং আর সুরের এ এক অসাধারণ ঐক্যতান। এ যেন বাংলাদেশের বুকে রং আর সুরের অঞ্জলি।  এই সব মিলেই জাফলং এর সৌন্দর্যের মহিমা।

সিলেট থেকে মাত্র ৬০ কিমি অদূরে অবস্থিত জাফলং। যেতে সময় লাগে মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। বাস বা নিজস্ব ট্যাক্সিতে যাওয়া যায়। সিলেট থেকে যেতে যেতে দেখা যায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সবুজে ঢাকা পাহাড় আর সবুজের বুক চিরে নেমে আসা ঝর্না। প্রকৃতি যেন পাহাড় আর ঝর্ণাকে পর্যটকদের আকৃষ্ট করবার জন্য সাজিয়ে রেখেছে।

রাতারগুলের জলবনঃ   প্রকৃতির এক অকৃত্রিম সৌন্দর্য আর আপন খেয়াল হল সোয়াম্প ফরেষ্ট। বাংলায় অর্থ করলে দাড়ায় জলবন। জলের উপর দাড়িয়ে আছে এক বিশাল ঘন জংগল। জলের সঞ্জিবনি সুধায় পরিতৃপ্ত জংগলের প্রতিটি সদস্য। এ যেন অসংখ্য গাছ পালা, পাখির কলতান, জলজ-স্থলজ প্রানি সমৃদ্ধ এক গীতিকাব্য। সবুজে সবুজে চারদিক। সেই সবুজের ছোঁয়া পেতে নৌকায় ভেসে ভেসে যেতে হয়। নৌকার নিচে নির্মল জলরাশি, সেখানে ভেসে বেরাচ্ছে সাপ, মাছ, ব্যাঙ আরও কত কি! চারপাশে রয়েছে অসংখ্য লম্বা লম্বা গাছ আর সেই গাছের ডালে বাসা বেধে আছে নানা রঙের পাখি। সূর্যালোক খুব কমই পৌছায় জংগলের ভিতরে। আলো ছায়ার লুকোচুরির মাঝে এক স্নিগ্ধ পরিবেশ। রাতারগুল জলবন ঘোরার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হল বর্ষার শেষে শরত কালের শুরুর দিকে। কারণ বর্ষা শেষে প্রকৃতি সতেজতায় পরিপূর্ণ থাকে, গাছের পাতাগুলো ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয় আর নিচে থাকে টলমলে জলরাশি। সেই সাথে নীল আকাশটা সাদা মেঘের ভেলা। সবমিলে জল জংগলের মহাকাব্য।

রাতারগুল যাওয়া খুব কঠিন কিছু নয়। সিলেটের প্রধান শহর থেকে সি এন জি তে যাওয়া যায়। সময় লাগে প্রায় এক থেকে দেড় ঘন্টা। তারপর নৌকায় করে রাতারগুল জলবনের ভিতরটা ঘুরে আসতে আর  কতক্ষন। সময় যে কখন শেষ হয়ে যাবে টেরই পাওয়া যায় না।

 

types: 
Article

Facebook comments