সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে বাংলাদেশের সংস্কৃতি

ছেলেবেলার অনেক পুরাতন পড়া মনের মধ্যে উকি দিয়ে যায়। ‘মানুষ সামাজিক প্রাণী’ তেমনি একটি পড়া। সমাজবিজ্ঞান বইতে পড়েছিলাম। সমাজের ভিতরে কাধে কাধ মিলিয়ে চলতে চলতে মানুষের মাঝে একধরণের ভাল লাগা-মন্দ লাগা, কিছু রীতি-নীতি, নিয়ম-কানুন গড়ে ওঠে। তাকে সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায় সংস্কৃতি বলা হয়ে থাকে। প্রতিটি সমাজ-দেশ-জাতির একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি আছে। প্রতিটি মানুষ তার জন্মের পর থেকে সেই নির্দিষ্ট সংস্কৃতির পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠে। যাকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যক্তিত্ব-জীবনবোধ-সততা-আদর্শ আবর্তিত হয়। তাই আমার মনে হয় একটি দেশের সংস্কৃতি সেই জাতির পরিচয়পত্রের মতো। জাতিগতভাবে বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি আছে। সেটাই আমাদের পরিচয়। কিন্তু নানা ধরনের আগ্রাসনের কারণে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের লালিত সংস্কৃতি আজ প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম। এই আগ্রাসনের পিছনে আমাদের ভূমিকা খুব কম নয়। খাবার টেবিলে যতই আমরা দেশি মুরগীর ঝোল খুঁজি না কেন; কেনাকাটায় সেই পাশ্চাত্য ছোঁয়া, বিনোদনে ইন্ডিয়ান সিরিয়াল খুঁজে বেড়ায়। এমনকি আমাদের শিশুরা পর্যন্ত ডোরেমন সংস্কৃতিতে গা ভাসায়। এখনকার শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান হল ‘ডোরেমন’ কার্টুন। এ প্রসঙ্গে এই কার্টুনটি সম্পর্কে দু’একটি কথা বলতে চাই। ডোরেমন একটি জাপানী কার্টুন। এটি হিন্দিতে ডাবিং করে ইন্ডিয়ান একটি চ্যানেলে প্রচারিত হয়। এই কার্টুনের প্রধান চরিত্রের নাম নমিতা। সে একটি মহা ফাকিবাজ, আলসে এবং গাধা টাইপের একটি ছেলে। স্কুল থেকে দেয়া বাড়ির কাজ-পড়াশুনা কিছুই করতে চায় না। দেরী করে ঘুম থেকে ওঠে, যার ফলে স্কুলে আসতে প্রায়ই দেরী হয়ে যায়। এর মধ্যে আবার ক্লাশের একটি মেয়ের প্রতি একটু আধটু ভালবাসার টানও আছে। তাই ক্লাশে সে নাম-যশ পেতে চায়। ডোরেমন নামে একটি ভিনগ্রহের রোবটের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। কি এক অজানা কারনে ডোরেমন তাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। আর সেই বলে বলিয়ান হয়ে নমিতা ক্লাশে নায়কের সম্মান পেতে থাকে। এখন প্রশ্ন হল এই কার্টুনটি দেখে আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েরা কি শিখছে? তারা শিখছে যে কি করে অন্যের মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে নিজের কৃতিত্ব জাহির করা যায় এবং অল্প পরিশ্রমে কি করে নাম-যশ কামানো যায়। আর সেই নাম-যশ এর দ্বারা কিভাবে ভাললাগার মানুষকে আকৃষ্ট করা যায়। এভাবে চলতে থাকলে নৈতিকতা-আদর্শ-নিয়মানুবর্তিতা-সততা শব্দগুলো শিশুদের কাছে শুধুমাত্র অভিধানের শব্দ হয়েই থাকবে, বাস্তবজীবনে তারা কিছুই শিখবে না। এদিকে প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণের কিছু কিছু দোকান ডোরেমন বিষয়ক কার্টুনের বইয়ে সয়লাব থাকে। বইমেলাতে দেখা যায়, আমাদের শিশুরা আমাদের দেশের লেখকদের এত ভাল ভাল শিশুসাহিত্য বাদ দিয়ে ডোরেমন কার্টুনের বইয়ের দিকে ঝুকে পড়ছে। বাংলা ছেড়ে হিন্দিতে কথা বলা শুরু করছে। অথচ আমাদের দেশে সিসিমপুর, মীনা কার্টুনের মত কিছু জনপ্রিয় কার্টুন তৈরি হচ্ছে। যেখানে শিশুদের জন্য রয়েছে মজার সব তথ্য, শিক্ষনীয় বিভিন্ন বিষয় এবং নির্ভেজাল বিনোদন। কিন্তু শিশুরা ডোরেমন সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। বাংলাদেশের সংস্কৃতি আজ কোথায় গিয়ে ঠেকতে যাচ্ছে তার একটা গল্প বলি। গত বছর বইমেলাতে একটি ঘটনা দেখে চোখ প্রায় কপালে ওঠার যোগার। একটি ৫/৬ বছরের ছেলে বাংলা একাডেমীতে ভাষা শহিদদের ভাষ্কর্্যচ দেখে তার বাবা কে বলছে, “বাবা মুর্তিগুলো বহত খুব সুরত হে।” বাবাটি এই হিন্দি-বাংলা মিশ্রিত কথাটি শুনে আশে পাশে তাকালেন। একটু যেন লজ্জা পেলেন। তারপর ছেলেটিকে বেশ কড়া করে ধমক দিলেন। আসলে অনেকদিন আগে থেকেই আমরা বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে এক অদ্ভূত ভাষায় কথা বলে থাকি। এখন বাংলার সাথে ইংরেজি ও হিন্দি মিশিয়ে আরও উন্নতধরণের খিচুড়ি ভাষার সৃষ্টি হচ্ছে। সংস্কৃতির একটি বড় অংশ হলো ভাষা। ভাষা আন্দোলনের মাসে অমর একুশে বইমেলাতে দাড়িয়ে যদি এই চিত্র দেখতে হয় তাহলে আমাদের আর থাকলটা কি? এবার আসি ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের প্রসঙ্গে। স্যাটেলাইট টিভির কল্যানে ইন্ডিয়ান বাংলা ও হিন্দি উভয় সিরিয়ালের জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী। তরুন-তরুনী থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এমনকি শিশুরা পর্যন্ত সবাই এখন ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের ভক্ত। এই সমস্ত ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের মূল বিষয়বস্তু হল কুটচাল, অবিশ্বাস, সম্পত্তি নিয়ে ষড়যন্ত্র, পরকীয়া, সামনে মিষ্টি কথা দিয়ে পিছনে ছুরি মারার প্রবনতা ইত্যাদি। এগুলো দেখার ফলে ধীরে ধীরে আমাদের ভিতরের সামাজিক বন্ধনগুলো আলাদা হয়ে যাচ্ছে। মানুষ হয়ে পড়ছে মানসিকভাবে একান্ত একা এবং শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। ইন্ডিয়ান সিরিয়াল বিষয়ে আমার একটি অভিজ্ঞতা এখানে তুলে ধরতে চাই। আমার চারপাশের সবাই ইন্ডিয়ান সিরিয়াল এত মজা করে উপভোগ করে দেখে আমিও মাঝে-মধ্যে দু’একটি সিরিয়াল দেখেছি। একবার এক সিরিয়ালে দেখি-একটি মেয়ে আরেকটি মেয়ের ঘরে কলমের ভিতরে লুকিয়ে একটি ওয়েব ক্যামেরা রেখে আসলো কলমদানীতে। উদ্দেশ্য হল দ্বিতীয় মেয়েটি প্রথম মেয়েটির বিরুদ্ধে কি ধরণের ষড়যন্ত্র করে তা দেখার জন্য। ঘটনাটি সাদা চোখে দেখলে খুব সাধারণ বলে মনে হলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশ ভয়ঙ্কর। শোবার ঘর যেকোন মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত জায়গা। এখন এই ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কেউ যদি আমাদের কারও ঘরে এই ধরণের ক্যামেরা দিয়ে আড়িপাতে, তাহলে যে কারোর একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা হুমকির সম্মুখিন হবে। ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারী ঘটেছিল এই আড়িপাতাকে কেন্দ্র করে। আড়িপাতা সব দেশে-সব অনুশাষনে-সব সংস্কৃতিতে নিষিদ্ধ। ইন্ডিয়ান এই সব সিরিয়ালে সেই আড়িপাতাকে উষ্কে দিচ্ছে। তাই বলে আমি বলছিনা যে, কোন ইন্ডিয়ান চ্যানেল দেখা যাবে না। আমরা একে অন্যের সংস্কৃতি-কৃষ্টি জানব, সমাজ সচেতনে বিশেষ ভুমিকা রাখব এটা সাভাবিক। কিন্তু এখন এই সব ইন্ডিয়ান চ্যানেল এর দৌরাত্মে আমাদের নিজস্ব শিক্ষা-সংস্কৃতি-মুল্যবোধ হারিয়ে যেতে বসেছে। ভারতে যেখানে আমাদের বাংলাদেশি চ্যানেল প্রায় চলে না বললেই হয়। সেখানে আমরা মুল্য দিয়ে ভারতের এই সমস্ত চ্যানেল চালিয়ে থাকি। এই মুল্য আজ আর্থিক মুল্য দেয়ার ক্ষেত্রে থেমে নেই, এইসব চ্যানেল এর কারণে আজ আমাদের সাংস্কৃতিক-শিক্ষা-কৃষ্টির মতো সংবেদনশীল জিনিষের মুল্য দিতে হচ্ছে। আমাদের পরবর্তি প্রজন্ম সংসার জীবনের সুস্থ-সুন্দর দিক জানার আগেই তারা কুটচাল-পরকীয়ার অসুস্থ দিকগুলো জেনে যাচ্ছে। যার ফলে পরিবার-পরিজন-সমাজের মধ্যে স্নেহ-মায়া-মমতা-ভাতৃত্ববোধের এক অভাব চলছে। আমি বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচারের বিরোধী নই, শুধু যেকোন চ্যানেল সম্প্রচারের অনুমতি দেবার আগে সেই চ্যানেলটি আমাদের বাংলাদেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি-সামাজিক রীতি নীতির সাথে মানানসই হয় কিনা সেটা যাচাই করার অনুরোধ করছি সরকার কে। আর পরিশেষে নিজেদেরকেও ভাল-মন্দ বিচার করে চ্যানেল নির্বাচনের আহবান জানাচ্ছি। আমার ধারণা, সংস্কৃতি অনেকটা শক্তির নিত্যতার সূত্রের মত-এর কোন বিনাশ নেই-আছে শুধু রূপান্তর। অর্থ্যাৎ কালের স্রোতে প্রকৃতির নিয়মে তা বদলাবেই। কিন্তু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে বদলাতে গেলে ঘটবে বিপত্তি। ইতিহাসের বিভিন্ন অলি-গলি ঘুরলে দেখা যায়, বহু আগে থেকেই নানা সময়ে জোর জবরদস্তি করে আমাদের সংস্কৃতিতে অন্যদেশের সংস্কৃতি অনুপ্রবেশ করবার চেষ্টা করা হয়েছে। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ’৫২ ও ’৭১ সালে মাতৃভাষা এবং মাতৃভূমি রক্ষার মাধ্যমে যে সংস্কৃতিকে বাচিয়ে রেখে গিয়েছিলেন আমাদেরই অগ্রজগণ। নিজেদের ভুলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে সেই সংস্কৃতি যদি বদলে যায় তাহলে সেটাই হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।
types: 
Article

Facebook comments