আমাদের পর্যটন শিল্প আমাদেরকেই বাচাতে হবে।

আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী! ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আখি না ফেরে!… প্রতিটি সন্তানের চোখে যেমন সবচেয়ে সুন্দরতম মুখটি হল তার মায়ের, তেমনি প্রতিটি মানুষের কাছে মা-মাটি-দেশকে নিয়ে লেখা গান-কবিতা সবচাইতে শ্রুতিমধুর পঙতিমালা। কী অসাধারণ হৃদয়গ্রাহী করে রবিঠাকুর বাংলার রূপকে তার লেখা আর সুরের ক্যানভাসে তুলে এনেছেন। কবিতার মত যেন এই দেশ। ছন্দে-বর্ণে-গন্ধে সেই রূপ যেন বাংলার প্রতি অঙ্গে অঙ্গে ঠিকরে বের হচ্ছে। সেই দেশমাতৃকার রূপ খুজতে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ি আমরা কয়েক তরুন। এই তো সেদিন ঘুরে এলাম ‘লালাখাল’। কী অপরূপ! কী তার শোভা!! মনের অজান্তে গুন গুন করে গেয়ে উঠি-‘কী শোভা কী ছায়া গো…কী স্নেহ কী মায়া গো।’ ধুসর পাহাড়ের পাদদেশে নীলনয়না নারীর চোখের মত এক চিলতে স্বচ্ছ নীল পানি। একটি খাল। দুই পাশে ঢালু পাড়। সেই পাড়ে রয়েছে অসংখ্য সবুজ গাছ-গাছালী আর পাখ-পাখালী। যেন শিল্পীর তুলিতে আকা সবুজের হাতছানি। মাঝে বয়ে চলছে নরম-কোমল-স্নিগ্ধ নীল জলরাশি। শুধুই কি নীল? মনে হয় নীল আর সবুজের এ যেন অপূর্ব মেলবন্ধন। সেই রঙের নাম হয়ত চিত্রশিল্পীগণ বলতে পারবেন। সেই রঙে আমার চোখ ধাধিয়ে গেল। চোখও যেন পলক ফেলে সময় নষ্ট করতে চায় না-গো গ্রাসে গিলতে থাকে সেই মোহনীয় রূপ। চোখে লেগে থাকা সব রঙ যেন ছড়িয়ে গেল তনু-মনে-কর্মে-মর্মে। স্বচ্ছ জলরাশির নিচে সোনালী রঙের বালুকণা যেন সেই রূপকে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। এই হলো লালাখালের রূপ। এখানে যাবার জন্য বেশি কষ্ট করতে হবেনা। শুধু মনের ঐকান্তিক ইচ্ছাই যথেষ্ঠ। সিলেটের অদূরে জাফলং যাবার পথে সারিয়াঘাট নামে একটি সুন্দর জায়গা আছে। ব্যাস, বাস থেকে নেমে পড়লেই হল। পাওয়া যাবে অপার সৌন্দর্য্যের লালাখাল। অনেক সম্মানিত পাঠক হয়ত ভাবছেন নতুন বছরের শুরুতে কি এক লালাখাল নিয়ে অযথা কচকচানি করছে লেখক। আর লালাখালের মত আরও কত সুন্দর জায়গা আছে এদেশে। আমার কথাটা সেখানেই। আমরা বহু খরচ করে দুর-দুরান্তে ঘুরে বেড়াই। কিন্তু আমাদের দেশেই দেখার মত অনেক সুন্দর জায়গা আছে। সেগুলোর দিকে আমাদের নজর কম। তার মানে আমি বলছি না যে, দেশের বাইরে যাওয়া যাবেনা। দেশের বাইরে যেতে হবে আমাদের চিন্তা-চেতনা-মনন কে আরও অগ্রসর করার জন্য। অনেক দেশে কৃত্রিম পার্ক বা জলরাশি আছে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য। ওদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভুমি হল আমাদের এই দেশ। ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। এদেশে মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার মত বড় বড় নদী আর দক্ষিনে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এই নদী আর সাগর এই দেশকে বদ্বীপে রূপ দিয়েছে। পলিমাটি দিয়ে তৈরী বাংলাদেশ যেন মহাকবির কাব্যগাঁথা। শুধু কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন-সুন্দরবন-পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, বাংলাদেশের প্রতি পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে এই অতুলনীয় রূপ। গত বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি এদেশের বিভিন্ন পর্যটন স্থান নিয়ে তৈরী করা একটি প্রামান্যচিত্র দেখেছিলাম। বারবার চোখ জলে ভিজে আসছিল। শুধু মনে হচ্ছিল এত অপূর্ব আমার দেশ! এই মোহনীয় রূপ হল আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। পাহাড়-নদী-সাগর-সমতল সব যেন একাকার হয়ে তাদের সৌন্দর্য্যের সাজি সাজিয়ে বসে আছে। প্রকৃতির এই রূপকে পুজি করে আমরাও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি। পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখতে পারে। তার জন্য চাই আমাদের নিজেদের সদিচ্ছা ও আগ্রহ। সরকারের ভুমিকাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি। খুজে খুজে প্রতিটি সুন্দর জায়গাকে আরও আকর্ষনীয় করে সাজানো দরকার। মুলতঃ সঠিক উপস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, সুযোগ-সুবিধা, সঠিক পরিচর্যা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে অনেক দর্শনীয় স্থান কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। সুদক্ষ ট্যুর গাইড, দুঃসাহসিক ও রোমাঞ্চকর নানা ধরণের রাইড, সুসজ্জিত আন্তর্জাতিক মানের হোটেল এবং অন্যান্য বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সাজিয়ে তুলতে পারলে প্রতিটি পর্যটন স্থান হয়ে উঠবে আরও আকর্ষনীয়। তার সাথে প্রয়োজন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তাহলে সৌন্দর্য্য পিয়াসি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভবপর হবে। অন্যদিকে প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জায়গার সঠিক ইতিহাস-ঐতিহ্য-সৌন্দর্য্য-জীববৈচিত্র্য কে মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং তা সংরক্ষনের ব্যপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করাটাও পর্যটন করপোরেশনের অন্যতম দায়িত্ব। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক অবস্থা অস্থিতিশীল থাকলে বিদেশী বিনিয়োগ যেমন মুখ থুবড়ে পড়ে তেমনি বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এ ব্যপারে সমস্ত রাজনৈতিক সংগঠন, সকল শ্রেনী-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একটি দেশের শিশুরা যদি সেই দেশের ভবিষ্যত কর্ণধার হয় তাহলে বয়োজৈষ্ঠ্য নাগরিকগনকে বলা হয় অভিজ্ঞ উপদেষ্টা। আর তরুণরা হল দেশের শক্তি-সাহস-অনুপ্রেরণা। যেকোন দুর্যোগ বা কঠিন সময়ে বিদগ্ধ এইসব বয়োজৈষ্ঠ্য নাগরিকদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তরুণদেরকেই ঝাপিয়ে পড়তে হয় পরিস্থিতি মোকাবিলায়। দেশের উন্নতির জন্য অগ্রসেনা হল এই তরুনরাই। চাদাবাজি-টেন্ডারবাজি-লেজুড়বৃত্তি করে নিজের বা দেশের উন্নতি কখনও সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি হলেই হবে নিজেদের আসল উন্নতি। আর তরুন বয়সে দেশের প্রতি ভালবাসা থাকে তুঙ্গে। দেশের পর্যটন শিল্পকে বাচাতে হলে তরুনদের এগিয়ে আসতে হবে। এদেশের প্রতিটি জায়গার সৌন্দর্য্যকে নিজে উপভোগ করে বিভিন্ন ব্লগে বা সামাজিক ওয়েবসাইটগুলোতে সেই সব সুন্দর সুন্দর জায়গার বর্ণনা ও ছবি দেয়া যেতে পারে। আবার প্রতিটি সুন্দর জায়গা যেন কোমলপানীয়ের ক্যান, সিগারেটের প্যাকেট, চিপসের প্যাকেট, আবর্জনা দিয়ে নষ্ট না হয় সেদিকে বিশেষ নজর রাখাটা খুবই জরুরী। এভাবে আমরা তরুনরা আমাদের তারুন্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন শিল্প কে বিশ্বের দরবারে নিয়ে যেতে পারব বলে আমার বিশ্বাস। শুধু ভিতরে জ্বলতে থাকা আগুনটাকে একটু উষ্কে দিতে হবে। তাহলে জীবনানন্দের সেই পঙতিমালা ‘বাংলারমুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’স্বার্থক হবে।
types: 
Article

Facebook comments