সড়ক দুর্ঘটনা দায় কার?

বেশ কিছুদিন থেকে বাংলাদেশ এক অস্থির সময় পার করছে। সড়ক দূর্ঘটনার জের ধরে স্কুলের বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েরা সরকার বা বিরোধীদল এমনকি আমাদের মত জেগে জেগে ঘুমিয়ে থাকা সবার চোখে আঙুল দিয়ে আইনের সুশাষন শিখিয়ে দিচ্ছে। আমার মত এক নগন্য মানুষও মনে একটা জোর পাচ্ছে। এবার হবে, হতেই হবে। অনেকটা নির্লজ্জের মত বাচ্চাদের দেখানো পথে চলতে আর ভয় করবেনা আমার। 
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা গণমাধ্যমে এই শিশু কিশোরদের উপর যে ন্যক্কারজনক হামলা হচ্ছে তার ভালই প্রতিবাদ করছেন জ্ঞানীজনেরা। সেসব বিষয়ে মৌন সম্মতি জানিয়ে এই অধম আর কথা না বাড়িয়ে অন্যদিক থেকে বিষয়টিকে একটু দেখতে চায়। 
ছোটবেলা থেকে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কান্চনকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন করতে দেখা গেছে। আর যে খুব বেশি কেউ এই আন্দোলন করেছেন মনে পড়ে না। নিরাপদ সড়ক আমরা ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে চাইতে পারি। সেটিই সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য দাবী। কিন্তু সরকার বাহাদুর যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কে দিয়ে নিরাপদ সড়কের ব্যবস্থা করবেন তাদের কে আরও দ্বায়ীত্বশীল হতে হবে।
আমি একটা দেশের সড়ক ব্যবস্থা অনিরাপদ হওয়ার পেছনে মোটাদাগে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি দেখে থাকি।
প্রথমত প্রকৌশলগত বিষয়: একটি রাস্তার যখন নকশা প্রণয়ন করা হয় তখনই রাস্তার প্রয়োজনীয়তা, কারা ব্যবহার করতে পারবেন বা কোন কোন যানবাহন চলবে তার একটা পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা মাফিক রাস্তায় ঢোকা বা বের হবার নিরাপদ ব্যবস্থা, সিগন্যাল ব্যবস্থা, গতি সীমা, কী কী ধরনের যান চলবে তার নকশা করা হয়। যেমন:হাইওয়ে রাস্তা বা পাড়ার ভিতরের রাস্তার ঢোকা বা বের হওয়া, সর্বোচ্চ গতি সীমা, সিগন্যাল বা চলাচলের উপযোগী যানবহনের ধরণ আলাদা হবে এটাই স্বাভাবিক। হাইওয়ে রাস্তার জন্য এমারজেন্সি লেন থাকে, কম গতি সম্পন্ন যান যেমন রিকশা চলতে পারে না, সর্বোচ্চ গতি ৮০ থেকে ১২০ কিমি প্রতি ঘন্টায় হয়ে থাকে। এই ধরণের রাস্তা হেঁটে পার হওয়া যায় না এমনকি কাছাকাছি ফুটপাত বা দোকান, বাড়ি কিছুই থাকে না। এখন চিন্তা করুন উত্তরা থেকে মহাখালি বা গাবতলি থেকে আরিচা রাস্তার বা চট্টগ্রাম চার লেনের হাইওয়ে কথা। এগুলো কি হাইওয়ে বা সেমি হাইওয়ে নয়? সেই রাস্তায় কী কী নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। এই রাস্তাটির সর্বোচ্চ গতি সীমা কত? কতজন আমরা ফুট ওভার ব্রীজ ব্যবহার করি? রিকশা, নসিমন, দুরপাল্লার বাস, ট্রাক,মোটরসাইকেল একই রাস্তায় চলছে কিনা? এছাড়া শহরের ভেতরকার রাস্তার কথা বলি। ডানে বা বামে যাবার জন্য আলাদা সিগন্যাল বা আলাদা লেন আছে কি ঢাকার রাস্তায়। এসবই তো নকশার অন্তর্গত। রাস্তা ডানে বা বামে ঘোরবার সময় প্রয়োজনীয় বক্রতা বা সুপার এলিভেশনের দরকার হয়, নতুবা দুর্ঘটনার শিকার হয় মানুষ। সেটি কতগুলো রাস্তায় সঠিকভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। 
বুয়েটে পড়ার সময় দেখতাম বুয়েটে আ্যকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টার আছে। এতগুলো বছরে জাতীয় দৈনিকে তারা দুর্ঘটনার কারণ সংক্রান্ত কী তথ্য ও উপায় বা সুপারিশ প্রকাশ করেছে যা দেখে সরকার ও সাধারণ মানুষ বা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান সচেতন হবে ও রাস্তার ত্রুটি মুক্ত করবার ব্যপারে সচেষ্ট হবে। আরেকটি রাস্তার উদাহরণ দেয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। সেটি হল গোয়ালন্দ ঘাট থেকে চুয়াডাংগা যাবার রাস্তা। এই রাস্তাটি আমি খুব ভাল চিনি, কারণ আমার জেলা চুয়াডাংগা। এই রাস্তাটি দুই লেনের। এখানে দুরপাল্লার বাস ট্রাক প্রায় ১০০ -১২০ কিমি বেগে চলে আর সেই সাথে চলেন মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, রিকশা, পায়ে চলা মানুষ। কোন গতিসীমা আছে বলে মনে হয় না আমার এই রাস্তায়। এখন এই রাস্তার দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কে? সবার ব্যবহার উপযোগি করতে হলে দ্রুত ও নিম্নবেগে চলা যানবাহনের জন্য আলাদা লেন ও ডিভাইডার দিতে হবে এই রাস্তায়। ফলে রাস্তা হবে আরও চওড়া। এখন এই চওড়া রাস্তার জন্য সরকারের জমি অধিগ্রহন করতে হলে আবার জমির মালিকদের আন্দোলনের মধ্যে পড়তে হবে বলে এই অধম আশা করে। 
২ ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি: কোন অবস্থাতে রাস্তায় আনফিট গাড়ি বা লাইসেন্সবিহিন চালক চলতে পারবেনা। কিন্তু কি দেখছি আমরা ? সরকারের আইনকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে চলছে সবকিছু। সরকারের ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে এটি সম্ভব হচ্ছে। উন্নতদেশে রাস্তায় ড্রাইভিং টেস্টের আগে কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে হ্যাজার্ড পারসেপশন টেস্ট নেওয় হয়। আমাদের দেশে সেটির ব্যবস্থা আছে কিনা জানা নেই আমার। বলতে লজ্জা নেই আমি বিদেশে চার বার ফেল করে অবশেষে ঐ পরীক্ষা পাশ করেছি। একজন বাস বা ট্রাক ড্রাইভার কে কমপক্ষে তিন চার বছর বিভিন্ন প্রশিক্ষন পরীক্ষার মাধ্যমে ভারী যান চালাবার লাইসেন্স দেয়া হয় উন্নতদেশে। আমার তো মনে হয়না বাংলাদেশে এই ভাবে ভারী যান চালাবার লাইসেন্স দেয়া হয়। আমাদের দেশে বহু মেধাবী প্রকৌশলী বা ব্যবস্থাপনা বিদ্যায় পারদর্শী ব্যক্তিবর্গ আছেন বিআরটিএ বা সড়কও জনপথে যারা বিদেশে পড়াশোনা করেছেন বা নিদেনপক্ষে ট্রেনিং করেছেন। তারা নীতি নির্ধারক হওয়া সত্ত্বেও কেন এই বিষয়গুলো প্রয়োগ হয় না। আমার মনে হয় না সরকার বাঁধা দেবে ভাল কিছু করবার ব্যপারে। তবে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের নির্মাণ কাজের কন্ট্রাক্টরের প্রকল্প পরিচালক থাকাকালীন সরকারী ননটেকনিক্যাল আমলাদের খুব হম্বিতম্বি দেখছি। মনে হত তাঁরাই বড় প্রকৌশলী আর আমরা চাকর বাকর। হয়ত এসব ক্ষেত্রে তাই হয়।
আরেকটা কথা রাস্তায় সয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল থাকলে ট্রাফিক পুলিশের মোড়ে মোড়ে কী দরকার? 
বাংলাদেশে যারা দুরপাল্লার গাড়ি চালান বা অন্যের ব্যক্তিগত গাড়ি চালান তারা অধিকাংশই দরিদ্রপরিবারের লোক। তাদের বেতন কম, শিক্ষা-দীক্ষা নেই বললেই চলে। তারা নিজেদের সংসার চালানোর জন্য ১২-১৮ ঘন্টা আগুন গরম ইন্জিনের পাশে বসে গাড়ি চালান। একটা লোক এরকম অসাস্থ্যকর পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালালে তার মাথার ঠিক থাকার কথা নয়। আসলে এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ণ না করতে পারলে সমস্যার সমাধান রাতারাতি হবে না। 
বিদেশে রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্পীড, রেডলাইট, গড়বেগ নির্ধারণ করার ক্যমেরা দেখেছি। এখনতো একজন চালক রাস্তায় কিরকম উশৃংখল আচরণ করছেন কিনা সেটাও দেখার জন্য ক্যামেরা আছে। আমাদের দেশে সেসব ধীরে ধীরে প্রয়োগ করতে হবে। তবেই নিরাপদ সড়ক আমরা পেতে পারি। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে সরকার কে সাহায্যের জন্য। নিয়মিত কর পরিশোধ করতে হবে। প্রয়োজনে করের পরিমান বাড়ানো লাগতে পারে। কারণ করযোগ্য উপার্জন করার ও করফাকি না দেবার লোকের খুব অভাব। আমি নিজে ৩৭% কর দিয়ে থাকি বিদেশে। 
৩ দূর্নীতি ও সুশাষণ: দূর্নীতি আমাদের জীবনে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এর থেকে যেদিন মুক্তি পাওয়া যাবে সেদিন সব ঠিক হয়ে যাবে আমার বিশ্বাস।
আমাদের মূল সমস্যা হল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে সমস্যাকে অন্য খাতে প্রবাহিত করা। আমাদের সবচেয়ে প্রধান সমস্যা হল দূর্নীতি। সেটা দূর করতে সব সরকার ব্যার্থ। আমরা নিজেরা দূর্নীতি করব না আর কাউকে করতেও দিব না। এটি আমাদের মূল মন্ত্র হওয়া উচিত। এখানে সরকারের থেকেও আমাদের মানসিকতার সমস্যা বেশি। আমাদেরকে যদি আমার অপরাধের জন্য কেউ কিছু বলতে আসে তখন আমাদের প্রথম উত্তর হয়, অমুখে করেছে ভুল সেটা আপনার চোখে পড়ল না, পড়ল আমারটা। মানে অন্যের উপর নিজেদের দ্বায়ভার দিয়ে আমরা আত্মতৃপ্তিতে থাকি। 
বর্তমানে বংলাদেশে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত উবার সার্ভিস চালু হয়েছে।এখনতো দেখা যাচ্ছে সেখানেও নাকি দূর্নীতি ঢুকে গেছে। দূর্নীতি দুর করতে পারলে কোটা আন্দোলন, প্রশ্ন ফাঁস, নির্বাচনে কারচুপি বা নিরাপদ সড়কের দাবী কিছুই করা লাগবে না। কে হাসলো বা কে কাঁদলো এসব বাদ দিয়ে দূর্নীতি দুর করার ব্রত নেয়া দরকার।বাচ্চারা যখন দ্বায়িত্ব নিয়েছে তখন খুব শিঘ্রই আমরা দূর্নীতিমুক্ত হবো আশা করি। 
সবশেষে নিজের একটি অভিজ্ঞতা বলি। আমি নিজে ঢাকায় মোটর বাইক চালাতাম। একদিন আমি ও আমার এক প্রকৌশলী বন্ধু বৃষ্টির পর উত্তরা থেকে মিরপুর আসছিলাম বিমানবন্দর সড়ক ধরে রাত ১০টার দিকে। রাস্তায় স্ট্রীট লাইট নেই খুব একটা। হঠাৎ আমরা রাস্তা থেকে এক বা দেড় ফুট উপরে উঠে গেলাম মটর সাইকেল সহ আবার নিচে ভাল ভাবে ল্যান্ডিং করলাম শুধু আমার চালানোর দক্ষতার জন্য। কারণ বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় উঁচু নিচু দেখা যাচ্ছিল না। রাস্তার ওপর ম্যানহোলের ঢাকনা রাস্তার লেভেল থেকে অন্তত ৬ইন্চি উঁচু করে ঢালাই করা। যার ফলে ৭০ -৮০ কিমি বেগে যাওয়া আমার বাইক ওটার উপর দিয়ে যাবার কারণে লাফিয়ে উঠেছিল।
শুধু সরকারের দোষ দিয়ে লাভ নেই কেননা সরকার আমাদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হচ্ছেন কেউ না কেউ। কোন বিরোধীদল কে দেখলাম না এইসব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয় গঠনমূলক আন্দোলন করতে বাচ্চাদের মত। তারা আছেন নির্বাচন, নেতা নেত্রীর মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এইসব নিয়ে। আমাদের সুস্থ মানসিকতাই পারে সব সমস্যার সমাধান দিতে।
types: 
Article

Facebook comments