অলাতচক্র মানে আগুনের চক্র। অনেকটা চক্রাকারে আবর্তিত আগুনে পুড়ে খাঁটি হওয়া কতগুলোচরিত্র। সম্প্রতি আহমদ ছফা লিখিত ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসটি পড়াশোনা করার সৌভাগ্য হলো। আহমদ ছফার লেখা যদ্যপি আমার গুরু, ওন্কার, গাভী বিত্তান্ত পড়ে যতটুকু বুঝেছিলাম যে, তিনিপ্রথার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে চলা একজন মানুষ। পাহাড়ের মত অটল ও শিশুর মত অকপটে সবকথা বলে ফেলার মানসিকতা সম্পন্ন একজন লেখক।বেশিরভাগের অবস্থা সংগীন হলেও সবার অবস্থা সমান ছিলনা। শরণার্থী নেতৃবৃন্দের কেউ কেউআবার ইন্দিরা গান্ধীর আতিথিয়েতার সুযোগ নিয়ে মোজ-মাস্তি করে বেড়াচ্ছেন, অনেকে জীবনবাজীরেখে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন,খন্দকার মোশতাকের মত কিছু নেতা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেচলেছেন। আশ্রয়হীন একটা জাতির উপর একটি ভয়ংকর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান সরকার।একটা ভংগুর সময়েও প্রবাসী সরকারের নেতৃবৃন্দের মাঝে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। কী বিচিত্রসেলুকাস! দেশ স্বাধীন হয়নি ; কবে দেশে ফিরতে পারবে, জানেনা কেউই;অন্যের দেশে আশ্রিতেরমতো করে থাকতে হচ্ছে আর এরমধ্যে শুরু হয়েছিল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। মূদ্রার উল্টোদিকও আছে। সেখানে দেখা যায়, কলকাতার কিছু অধীবাসীরা বাংলাদেশের ঘরহারা মানুষদেরকে নানা রকম যথাসাধ্য সাহায্য করছেন, কেউ কেউ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছেন। আবার কোনকোন গোষ্ঠি বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক বাব্যবসায়িক আখের গোছাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন। কলকাতার মানুষ কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে কমিউনিষ্টবিদ্বেষী মনে করত, কেউ কেউ সুবিধাভোগী মনে করত, কেউ কেউ মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে উদ্ভুদ্ধ নেতামনে করত আবার কেউ কেউ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা মনে করত। উপন্যাসের এই জায়গাটিযেন কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটি মনে করিয়ে দেয়।উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে একজন তরুণ লেখক দানিয়েল ও ক্যান্সারে আক্রান্ত তায়্যেবারজীবনের টানাপোড়ন, অস্ফুট ভালবাসা ও অতীত জীবনের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে। এমন না বলামিষ্টি মধুর স্বর্গীয় প্রেমের বর্ণনায় মুগ্ধ ও তৃপ্ত হয় পাঠক হৃদয়। অনেকে বলেন, যুদ্ধ নাকি মানুষেরঅনূভূতিকে নষ্ট করে দেয়। মানুষের চিরায়ত হাসিকান্না, রোগশোক বা খুনসুটি প্রেম সব কিছু যেনএকটু একটু অধরা হয়ে যায়। অনূভূতি ধরা দিয়েও যেন ধরা দেয়না। তাই মাঝে মাঝে দানিয়েলনিজেও তায়্যেবার সাথে তাঁর সম্পর্কের রূপ নির্ধারণ করতে পারতনা। দানিয়েল শুধুমাত্র প্রতিদিনহাসপাতালে তায়্যেবার সাথে দেখা করার জন্য বাস ভাড়া যোগাড় করতে গিয়ে হিমসিম খেতে থাকে।ওদিকে একদিন না আসলে তায়্যেবা ঠোঁট ফুলিয়ে থাকে। এ যেন অব্যাক্ত প্রেমের এক উপাখ্যান।একদিন খুব অসুস্থ অবস্থায়তায়্যেবার নিজের মুখে দানিয়েলকে বলা ‘ভালবাসি’ শব্দটুকু পাঠকেরমনকে আর্দ্র করে তোলে। তায়্যেবা নিজে বাংলাদেশে একজন স্বনামধন্য রাজনৈতিক কর্মী ছিল। ক্যান্সার তাঁর শরীরে জগদ্দলপাথরের মতো চেপে বসে একটু একটু করে নি:শেষ করে দিচ্ছে। ঠিক যেমন করে পাকিস্তান বাংলাদেশকে শুষে নিচ্ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ বহু মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণমানুষের আত্মত্যাগে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কিন্তু তায়্যেবাজীবনযুদ্ধে হেরে গেল। লেখকের ভাষায়দানিয়েল নতুন দেশ পেল তাঁর প্রিয়তম মানুষকে হারিয়ে। উপন্যাসটি ১৯৮৫ সালে নিপুন সাহিত্য পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে আরও ঘষামাজা করে১৯৯৩ সালে মুক্তধারা থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়। প্রতিটি ঘটনা পূর্ব দিকে ওঠা সুর্যোদয়েরআলোতে দেখলে একরকম আবার মধ্যাহ্ন পার হয়ে শেষ বিকেলের আলোতে দেখলে আরেক রকমলাগবে। আহমদ ছফা নিরপেক্ষভাবে দুই আলোতেই মুক্তিযুদ্ধকে দেখিয়েছেন। উপন্যাসটিতেআহমদ ছফা তাঁর সিগনেচারটি সঠিকভাবেই রেখে গেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *