১)
ক্যাসেট প্লেয়ারে একটানা একটি গান বেজে চলেছে। “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি তোমায়, দেখতে আমি পাইনি।” আমার মা ক্যসেটের ফিতা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেই গানটিই শুনছে আর ঘরের কাজ করছে। আমি তখন প্রাইমারী স্কুলে পড়ি। ছোটবেলায় যেটা হয়; প্রতিদিন একই গান শোনার কারণে স্কুলে প্রায় সারাদিন ঐ গানটি মাথায় ঘুরতে থাকত। স্কুল থেকে যখন হেঁটে হেঁটে বাড়ী ফিরতাম তখনও ঘুরত সেই হিয়ার মাঝে গানটি। 

একদিন বাড়ী ফিরে জিজ্ঞেস করলাম মাকে যে হিয়া মানে কী? মা প্রশ্ন শুনেই বুঝলেন যে, আমি কোথায় পেলাম এই হিয়া। খুব ছোট করে উত্তর দিলেন, “মন”। এখনও আবছা আলোয় মনে পড়ে, আমি বলেছিলাম, “হিয়া মানে ‘মন’। তার মানে মনের মাঝে লুকিয়ে ছিলে। তাহলে গানে হিয়া বলে কেন?” মা যে কী উত্তর দিয়েছিলেন আজ আর তা মনে নেই। তবে সেই সময় প্রায় আমার মনে হত যে, আমার মনের মাঝে কী এমন লুকিয়ে থাকতে পারে যেটি আমি দেখিনি। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে পেয়েছিলাম- কোকা কোলা। তখন কাঁচের বোতলে পাওয়া যেত। মাকে সলজ্জ ভংগিতে বলেওছিলাম সেই কথা। মা হেসে বলেছিল, “রবি ঠাকুরের গান শুনে কোকাকোলা খেতে মন চাইল? আর অন্যকিছু মনে হল না!” সেবারের মত কোকাকোলা খেয়েছিলাম। বোধকরি সেটি ছিল রবি ঠাকুরের দেয়া আমাকে উপহার। মধ্যবিত্ত সংসারে আমি সেই কোকাকোলা পেয়ে কী যে খুশি হয়েছিলাম! এখন মনে হলে হাসি পায়। মনে মনে রবীন্দ্রনাথ কে বেশ ধন্যবাদ দিলাম। 

একদিন স্কুলে গিয়ে শুনলাম প্রতিদিন পিটি করার সময় যে জাতীয় সংগীত আমরা গেয়ে থাকি
“আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালবাসি”

সেটিও নাকি রবীন্দ্রনাথের লেখা। আমি তো অবাক। মনে মনে ভাবি এ হতেই পারে না। রবীন্দ্রনাথ তো আমার হিয়ার মাঝে ঐ গানটি লিখেছেন। আবার এটাও লিখেছেন। হতেই পারেনা। আমার সেই উপহার দেয়া রবীন্দ্রনাথকে সকলের সাথে ভাগ করতে খুব মন খারাপ হয়েছিল সেদিন। 

বাড়িতে এসে মাকে বলতেই তিনি রবি ঠাকুরের গীতবিতান ও সন্চয়িতা বের করে দিয়ে বললেন, “এই দ্যাখ, রবীন্দ্রনাথ কত কিছু লিখেছেন”। আমি হাত দিয়ে বইগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতাম আর ভাবতাম এই এত সব লেখা কবিতা-গান-গল্প সঅঅব রবীন্দ্রনাথের? মা আমার হা করা মুখের দিকে তাকিয়ে বলতেন, “রবি ঠাকুর কে ভাগ করা যায় না বাবু, রবি ঠাকুর শুধু নিজের হয়। সবার রবি ঠাকুর আলাদা”। শুধু বোকার মত চেয়ে দেখা ছাড়া, কথাগুলোর মানে তখন বুঝতাম না।

“আচ্ছা মা, ঠাকুর মানে কী? উনি কি মা দুর্গার মত ঠাকুর? তাহলে তাঁর পুজা হবে কবে?” ঐ সময় আর কি কি বলেছিলাম আজ আর মনে নেই কথাগুলো। তবে এটুকু মনে আছে দূর্গাপুজা দেখে বাড়িতে ফিরে রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে এরকম একটি প্রশ্ন করেছিলাম। মা হেসেছিল সেদিন। তারপর বলেছিলেন,” ঠাকুর ওনার পদবী”

মনে মনে ভাবি “তার মানে উনি ঠাকুর নন। মানে পুজা করা লাগেনা।” মনে হল কথাখানা ভাবতে পেরে আমার বুকের ভার নেমে গেল। পুজা মানে তো আমার কাছে বছরে একদিন। 

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছড়া, সেই যে ‘ আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে বা তালগাছ এক পায়ে দাড়িয়ে’ হলো প্রতিদিনের। সবচেয়ে মজার ছড়া ছিল আমার কাছে বীরপুরুষ ও পুরাতন ভৃত্য। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কতবার যে যুদ্ধ করার স্বপ্ন দেখেছি বীর পুরুষ পড়ার পর। সে কথা আজ ভাবলে হাসি পায়। ঐ সবই ছিল আমার ছেলেবেলায় ঐ দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের সাথে দিনযাপন।
২)
যখন বড় হতে লাগলাম তত দিনে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান আমার মনে পাকাপাকি ভাবে আসন করে নিয়েছে। সেই আসন তলে বার বার লুটিয়ে পড়তে মন চাই। কিন্তু লুটোতে পারিনা; অমল ধবল পালে মেঘের সাথে ভেসে বেড়াতে পারি না; স্বপনচারিনীকেও বুঝিতেও পারি না। কারণ তখন আমার বয়:সন্ধীকাল। আমি কেবলই হিয়ার মাঝে লুকিয়ে থাকা কোকাকোলার বদলে মনের মানুষ কে খুঁজছি। খুঁজছি কিন্তু পাচ্ছিনা। অস্থিরতা ঘিরে ধরছে আমায়। একনাগাড়ে সন্চয়িতা, গল্পগুচ্ছ, গীতবিতান পড়ছি আর গান শুনেই চলেছি। সেই বড় হবার পথে রবি ঠাকুর যেন আমার সকল রসের ধারা ও সকল দু:খের প্রদীপ। আমি কান পেতে শুধু আমার মনে তাঁর নিত্য আসা যাওয়া অনুভব করি। 

সেই সময় কলেজে ঢোকার শুরুতে কোথায় যেন একটা মন্চ নাটক হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের রক্ত করবী। আমি কিন্তু এখন সত্যিই বিশ্বাস করি প্রত্যেক মানুষের রবীন্দ্রনাথ আলাদা। তাই আমি এখন তাঁর লেখাকে অন্যের সাথে ভাগ করে নিতে পারি অনায়াসে। নাটক দেখতে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখলাম নন্দিনী কে। কী তাঁর চলন, কথা বলার ধরণ। মনে হল আমার হৃদয় করেছে হরণ। রবীন্দ্রনাথের গল্প বা উপন্যাস থেকে যেন এক্ষুনি উঠে এসেছে। আমি যেন সেই মানসীর চরণ মন্জীরের তালে, বুকে পুষে রাখা গান গেয়ে চলেছি।

বুঝলাম হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলেন যিনি, 
তাঁরই পায়ে বেজে চলছে নূপূরের রিনিঝিনি। 
জন্ম-জন্মান্তর থেকে তাঁকে যেন চিনি
তাই তাঁর হাতেই তুলে দেব আমার হৃদয় খানি। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখন আমার বন্ধু হয়ে গেছেন। তাঁর সাথে সবরকম মনের কথা বলা যায়। তাই বাড়ি ফিরে রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হলাম। কারণ, প্রেম বিহারে আমি আজ ছন্নছাড়া। কেমনে বলি তাঁকে প্রণয়ের কথা। হাত দিয়ে কোন লেখনী বের হচ্ছে না। মনে হল বাড়ির বইয়ের আলমারির ভিতরে ঠাসা রবীন্দ্র রচনাবলি থেকে রবি ঠাকুর বেশ একটা ধমক দিয়ে বললেন,”আমি তোর জন্য সেই কবেই সব লিখে রেখেছি। তুই শুধু প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে খুঁজে নে তোর মনের কথা।” আমি একটুও বানিয়ে বলছি না। রবি ঠাকুর আমার মাষ্টারমশাই, বন্ধু, প্রতিযোগি এমনকি ঝগড়া করবার মানুষও। যার কাছ থেকে বাংলা সাহিত্য পড়তে শিখেছি। মনে হল রবি ঠাকুরের কাছ থেকে ধার করে নয়, তাঁর মত একখান কবিতা লিখেই সেই মানসীর সামনে দাড়াব। তাঁকে মানসী থেকে প্রেয়সী হবার আহ্বান জানাব। কিন্তু লিখতে গিয়ে কলম ভেঙে ফেললাম। কিন্তু কবিতা, গদ্য কিছুই বের হলো না। ভরসা আবার সেই রবি ঠাকুর। বইয়ের আলমারী থেকে বের হয়ে এসে পথ দেখালেন। সেই পথেই হেটে তাঁর নিকট থেকে ধার করে সেই তরুনীর সামনে দাড়িয়ে বলে গেলাম, 
“তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি
শত রূপে শত বার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।”

আমার সেই হেড়ে গলার পঙতিগুলো শুনে খুব খুশি হলো বলে মনে হলো না সেই তরুনী। হা হা করে হাসতে থাকল। হাসি থামলে শুধু বলল, “আমি অন্যের বাগদত্তা”। ব্যস হয়ে গেল। ছলছল চোখে ফিরে এলাম বাড়ীতে। 

মন ভীষন রকমের বেয়াড়া হয়ে গেছে। বাঁধ মানছে না। সবার সামনে বেদনা লুকিয়ে হেসে চলেছি। সেই হাসি অবশ্য কাষ্ঠ হাসি। আমার বেদনা দেখে বোধহয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর সইতে পারলেন না। আস্ত একখান গান লিখে ফেললেন। সেই অমর গান। যেটি সাগর সেন ক্যাসেটের ভিতর দিয়ে গেয়ে উঠলেন, 
“….যদি আরো কারে ভালবাস
যদি আর ফিরে নাহি আস
তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন হয়
আমি যত দু:খ পাই গো….”

শুধু মনে এতটুকু সান্তনা যে, আমি বোধহয় এখন ‘হিয়ার মাঝে’ গানের মানে জেনেছি। 

৩)
স্কুল-কলেজ ছেড়ে যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম পড়তে সেদিন কী যে ভাল লাগছিল। গুন গুন করে গেয়ে চলেছি “আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ” গানটি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু মতের বহু মতবাদের মানুষ থাকে। অনেকে আমার এই রবি প্রীতি কে পছন্দ করতেন না। কিছু কিছু লোক হিন্দু কবির লেখা গান কেন জাতীয় সংগীত হবে সেই সব অবান্তর প্রশ্ন করতেন। ততদিনে আমি রবীন্দ্রনাথের অনেক কিছু পড়ে ফেলেছি। টুকটাক সামান্য লেখা লেখি করি। আমার ভান্ডারে এখন অনেক বাংলা “Lexical Resource” সেটিও অবশ্যই রবিবাবুর কল্যানে। এজন্য রবি ঠাকুর আমার মাষ্টারমশাই। তবে একটা কথা না বললেই নয়। বলতে একটু সংকোচ বোধ হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে আমার খুব উচ্চ মার্গের কোন ভিন গ্রহের মানুষ মনে হয় নি কখনই। সবসময় মনে হয়েছে আমার পাশের বাড়ির বন্ধু। যাকে দেখা যায় না শুধু ছোঁয়া যায়। তাই মাঝে মধ্যেই আমি তাঁর সাথে কম্পিটিশনে নামতাম। তিনি যদি ‘তাল গাছ একপায়ে দাড়িয়ে’ লিখতে পারেন, তাহলে আমিও ‘বট গাছ দাড়িয়ে, আছে ঝুড়ি ছড়িয়ে’ লিখতে পারি। কিন্তু কেন যেন আমার কবিতা বা ছড়া ঐ কফি হাউসের গানের অমলের কবিতার মতো কোথাও কখনও ছাপা হয় না। 

যদিও কম্পিটিশন ছিল আমার মনে মনে রবিবাবুর সাথে। তবুও আমি সবার সামনে রবিঠাকুরের লেখার গুন গেয়েছি সবসময়। বলেছি, ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক হয়ে শুনি’।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় অনেকে আবার রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজ পাওয়া, পাশ্চাত্য বা বাউল গানের সুরে গান লেখাকে Plagiarism বলতেন। এক্ষেত্রে আমার মত হলো, এর মাধ্যমে রবি ঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। সেই সমৃদ্ধ করার কাজ অনেক কবি সাহিত্যিকও করেছেন যেমন: কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ ইত্যাদি।

কর্মজীবনে এসে কেন জানিনা, দেশের চিন্তা মাথায় ঢুকে গেল। “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে” গানটি খুব শুনতাম সেই সময়। সেই গানের একটি লাইন আমার মনে যেন আজীবনের জন্য গেঁথে গিয়েছিল। মনে হয় আজও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আমাকে, 

“আজি দুখের রাতে সুখের স্রোতে ভাসাও ধরণী–
তোমার অভয় বাজে হৃদয়মাঝে হৃদয়হরণী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে”

কেন গেঁথে গিয়েছিল বলতে পারিনা। শুধু এতটুকু বলতে পারি দেশ কে ‘দেশ মা’ হিসেবে দেখতে শিখলাম রবি বাবুর কাছে থেকে। এখানে একটা কথা না বললেই নয়। দেশ দেশ নিয়ে আমি তখন বেশ অতিউৎসাহি হয়ে পড়ছিলাম। দেশের উন্নতির জন্য কী কী করা উচিত আমাদের এই ভাবনা পেয়ে বসল অনেকটা হঠাৎ করেই। 
সেই সময় রবি ঠাকুর যেন নিদানের কান্ডারির ভূমিকা নিলেন। এরকম একটা সময়ে ‘দেশের উন্নতি’ নামক কবিতা আমার চোখের সামনে এল। সেখানে পেলাম এক নতুন রবি কে। বললেন, 
“সবাই বড়ো হইলে তবে
স্বদেশ বড়ো হবে,
যে কাজে মোরা লাগাব হাত
সিদ্ধ হবে তবে।
সত্যপথে আপন বলে
তুলিয়া শির সকলে চলে,
মরণভয় চরণতলে
দলিত হয়ে রবে।
নহিলে শুধু কথাই সার,
বিফল আশা লক্ষবার,
দলাদলি ও অহংকার
উচ্চ কলরবে।”

আমি বুঝলাম দেশের উন্নতি করতে হলে নিজেকে মানুষের মত মানুষ করতে হবে। 

৪)
তখন একটা অস্থির সময় পার করছে বিশ্ববাসি। চারিদিকে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। এরকম একটা সময়ের অসুস্থ রাজনীতির চাপে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যখন উপমহাদেশে নিষ্পেশিত। মনটা খুব ওলোটপালট হত। শুধুমাত্র ধর্মরক্ষায় মানুষ মানুষের উপর অত্যাচার অবিচার করছে। ইসরাইল, প্যালেস্টাইন, বাংলাদেশ, ভারত এমনকি ইরাক, ইরান, আফগান, সোমালিয়াতে মানুষ কে মানুষ না ভেবে চলমান ধর্মীয় ঝান্ডা ভাবা হচ্ছে। চলছে নির্যাতন। নাস্তিক আখ্যা দিয়ে লেখক ব্লগার প্রকাশক হত্যা চলছে সগৌরবে। তখন নিজেকে খুব অসহায় লাগত। পাগলের মতো আমি সে সময়টাতে রবীন্দ্রনাথ কে আঁকড়ে ধরেছিলাম। আমাকে তিনি বিমুখ করেন নি। তাঁরই লেখা পড়ে বুঝেছি ধর্মের বেশে মোহ যাদের ঘিরে ধরে, সেই সব ধর্মমূঢ়জন কিভাবে
মানুষের উপর নিপিড়ন করে। সেই সকল দাম্ভিক বকধার্মিকদের উদ্দেশ্যে তিনি যেন দ্ব্যার্থহীন চিত্তে বলে গেলেন, 
“বিধর্ম বলি মারে পরধর্মেরে,
নিজ ধর্মের অপমান করি ফেরে,
পিতার নামেতে হানে তাঁর সন্তানে,
আচার লইয়া বিচার নাহিকো জানে,
পূজাগৃহে তোলে রক্তমাখানো ধ্বজা, —
দেবতার নামে এ যে শয়তান ভজা।”

বুঝলাম আমার আর কিছু বলবার বা করবার নেই কারণ,সকল কিছুর বহু উপরে রয়েছে মানবতা, মানুষের উপর বিশ্বাস। কারণ মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো তো পাপ। মানুষের উপর বিশ্বাস করতে হলে আগে নিজের প্রতি ও নিজের মনের উপর বিশ্বাস করতে হবে। এটা রবীন্দ্রনাথ আমাকে শিখিয়েছেন। 
আমার এবার আবার বোধদয় হল যে ‘আমার হিয়ার মাঝে’যে লুকিয়ে আছে সে আসলে আমার ‘মনের মানুষ’ অর্থ্যাৎ ‘আমি নিজেই’। অর্থ্যাৎ সেই চিরাচরিত বাণী “Know Thyself” । নিজেকে খুঁজে পেলেই পাওয়া যাবে সব মানুষ কে, পাওয়া যাবে বিশ্ব মানবতা কে। 
সত্যিই তো 
“কেন এই হিংসা দ্বেষ, 
কেন এই ছদ্মবেশ
কেন এই মান অভিমান…”

-আচ্ছা। ঠিক আছে । বুঝলাম সব। বাবা, তুমি কি এখন বুঝতে পেরেছো সেই ‘আমার হিয়ার মাঝে’ কথাটির মানে?
-না রে মা। মনে হয় পারিনি। বয়সের সাথে সাথে এর মানে বিভিন্ন রূপে ধরা দিচ্ছে আমার কাছে। তাই তো তোকে বলি, ‘খবরদার, রবীন্দ্রনাথের প্ররোচণায় ভুলেও পা দিবি না।’
-কিন্তু বাবা তুমি আমাকে রবি ঠাকুর পড়তে নিষেধ করে নিজেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এত সুন্দর কথা বললে।”
-কই আমি তো তাঁকে প্রশংসা করি নি। কথাগুলো বললাম এই কারণে যে, সারাজীবন ঐ লোকটা আমাকে তাঁর হাতের মুঠো থেকে বের হতে দেন নি। তুই ওর কাছ থেকে পালিয়ে যা। নইলে দুনিয়ায় হয়ত আরও অনেক রবীন্দ্রনাথের মত লোক থাকতে পারে তাঁদের খুঁজে পাবি না। 
সব শুনে মেয়ে বলল,
“আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়”

সর্বনাশ?
সর্বনাশ! 
মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। বুঝলাম ঐ ভদ্রলোকের হাত থেকে আমার মত-আমার মায়ের মত-আমার মেয়েরও নিস্তার নেই। 

আসলেই বোধহয় একেকজনের কাছে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের মত। সবার রবীন্দ্রনাথ আলাদা। ভিন্ন ভিন্ন বয়সে ভিন্ন ভিন্ন যুগে রবি ঠাকুর সবার কাছে সেই সময়ের উপযুক্ত হয়ে ধরা দেয়। রবীন্দ্রনাথ বাস করেন একেবারে আধুনিক যুগে। রবি ঠাকুর বেঁচে থাকে যুগ থেকে যুগান্তরে বংশ পরম্পরায়। 

তাই রবিঠাকুর কারোর কাছে নরম নদীর জলের মত প্রবাহমান, চাঁদের আলোর মত স্নিগ্ধ শীতল আর আমার কাছে আকাশের মত, কখনও পুরোনো হয় না। সময় সময় রঙ বদলাতে থাকে। প্রতিদিন যেন নিত্যনুতন সাজে ধরা দেয়, সকল কালের সকল কবির গীতির মধ্য দিয়ে হৃদয়ের একুল ওকুল ভাসিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *